‘ভারতীয় দালাল’ হটাও আন্দোলন, পোস্টার ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশে

‘ভারতীয় দালাল প্রতিরোধ কমিটি’-র এই পোস্টার তখন সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। পোস্টারে বাম দিক থেকে বেলাল চৌধুরী, সুফিয়া কামাল এবং নাসিরউদ্দিন ইউসুফের ব্যঙ্গচিত্র

‘পূর্ব-পশ্চিম’—বিখ্যাত ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা উপন্যাসটি নিয়ে আলোচনা করতে ১৯৯১ সালে প্রথম ঢাকা যাই। এটা আমার বাংলাদেশে প্রথম পা ফেলা। সঙ্গে ছিলেন কলকাতা দূরদর্শনের তৎকালীন ডেপুটি ডিরেক্টর। সুনীলদার কাছে বিষয়টা উত্থাপনের দু’তিন বছর আগে থেকে মাথায় এই পরিকল্পনাটা চলছিল। সেই সময় দূরদর্শনের জন্য বহু রকমের প্রযোজনার সুবাদে এই ডেপুটি ডিরেক্টরের সঙ্গে একটা সখ্য তৈরি হয়। আমার ওই বয়সের দৌড়ঝাঁপ আর ভাবনাচিন্তা মাঝেমাঝেই ওনার কাছে গিয়ে বলতাম। প্রশ্রয় এবং উৎসাহ দুটোতেই কার্পণ্য করতেন না। তাই, ৯১ সালে প্রথম বাংলাদেশে যাওয়া এবং কিছু পূর্ব-পরিকল্পিত লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সময় ওনাকে পাশে রাখাটা জরুরি মনে করেছিলাম, পাছে অনেক সূক্ষ্ম অথচ জরুরি বিষয় বাদ চলে যায় নেহাতই আবেগের স্রোতে।

অনেক খোঁজ খবর নিয়ে ঠিক করা হল, এই ধারাবাহিক নির্দেশনা দেবেন বাংলাদেশের নাসিরউদ্দিন ইউসুফ, ডাকনামে যাকে বাচ্চু বলে তখন বা এখনও মানুষ চেনে। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। ৭১-এর স্বাধীনতার পর মুক্তিফৌজের যে দল ঢাকা শহরে প্রথমে ঢোকে, তার নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাংলাদেশের ‘ঢাকা থিয়েটার’ গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠা করেন এবং একের পর এক উঁচু মানের প্রযোজনা থিয়েটারপ্রেমীদের উপহার দেন। বাচ্চু তৎকালীন বাংলাদেশের বামপন্থী গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্যও ছিলেন। সব মিলিয়ে নাসিরউদ্দিন ইউসুফকে মনে করা হয়েছিল যে তিনি এই উপন্যাসের মূল বিষয়কে আত্মস্থ করে ধারাবাহিকটা নির্মাণ করতে পারবেন।

কলকাতা থেকেও ৮০-র শেষ এবং পরবর্তীকালে ৯০-এর দশকের বন্ধু এবং সফল পরিচালক মিলন রায়চৌধুরীকে ভাবা হয়েছিল সহযোগী পরিচালক হিসেবে। মিলনের পারিবারিক শিকড় বরিশালের। থাকত যাদবপুর-বাঘাযতীন অঞ্চলে। তাই ওপার বাংলা প্রীতি বা বাঙলাপনায় সেও খুব একটা কম যেত না। ৯১-র ঢাকা সফরে সার্বিকভাবে বাংলাদেশের দিকে কিছু জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। যার মধ্যে, পরিচালক নির্বাচন নিঃসন্দেহে জরুরিতম। বাংলাদেশ সরকারের কাছে ‘Intelligence-Clearance’-এর জন্য আবেদন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের অনুমোদন, বেশ কিছু নাটক দেখে নেওয়া, যার মাধ্যমে এক ধরনের শিল্পী বাছাই পর্ব আর ওপার বাংলার বন্ধুদের অতি-আতিথেয়তায় নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় – এই ছিল ১৯৯১-র ঢাকা-সফর বিন্যাস।

ঢাকা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন

ফিরে আসি ১৯৯২ সালের কথায়। ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটের চাকা বাংলাদেশের মাটি ছুঁল। আধঘণ্টার এই ফ্লাইট টাইমে সুনীলদার সঙ্গে কিছু কথা সেরে ফেললাম। সাংবাদিক সম্মেলনে কী বলা, কতটুকু বলা, আর কীভাবে কিছু কিছু বিষয় বাঁচিয়ে বলা। আমরা দু’জনেই জানতাম, যে এই প্রযোজনা যদি শুধু পশ্চিমবঙ্গে তৈরি হয়, তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস চাপা পড়ে যাবে। ঠিক অনুরূপ অবস্থা তৈরি হবে, যদি শুধু বাংলাদেশে এটি তৈরি করা হয়।

বিমানবন্দরে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ ওর কিছু বন্ধুবান্ধব সঙ্গে নিয়ে সুনীলদাকে সাদর অভ্যর্থনার জন্য উপস্থিত। বাংলাদেশের কবি এবং ভারতীয় দূতাবাসে কর্মরত সুনীলদার প্রিয় বন্ধু বেলাল চৌধুরীও এসেছিলেন আমাদের নিতে। ওই সময়ে সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গ্রহণযোগ্যতা বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজে বেশ ভালোরকম অনুভব করলাম। ছোট ছোট আড্ডায়, বাংলাদেশের ‘Who’s who’-দের সঙ্গে আলাপচারিতায় দেখছিলাম, আপাতভাবে তারা সুনীলদাকে যথেষ্ঠ মান্যতায় এবং ভালোবাসায় জড়িয়ে রেখেছিল। আর অবশ্যই সুনীলদার ওপার বাংলার শিকড় সেগুলোকে আরও মজবুত করেছিল, তাতে সন্দেহ নেই।

৬ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটায় ঢাকা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলনের ব্যবস্থা করা হল। প্রেস ক্লাব উপচে পড়ার জোগাড়, মূলত সুনীল গাঙ্গুলিকে দেখা এবং শোনার তাগিদে। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সুনীলদা, বাচ্চু, আমি ছাড়াও বাংলাদেশের প্রথিতযশা নাট্যকার সেলিম আল দীন, বেলাল চৌধুরী, কবি ইমদাদুল হক মিলন প্রমুখ। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আগামী একুশে ফেব্রুয়ারি পরিচালক নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ‘একুশে’-র ভোরে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে প্রভাত ফেরির ওপর প্রথম ক্যামেরা ধরবেন। সাংবাদিক সম্মেলনে সুনীলদা বললেন, “বাংলাদেশ থেকে যাঁরা পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি জমিয়েছেন, যাঁরা নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে সম্বলহীনভাবে দেশত্যাগ করেছে, মূল কাহিনিটি এখানেই আবর্তিত হবে। সিরিয়ালটি বিরাট ক্যানভাসের – কলকাতা, ঢাকা, লন্ডন, আমেরিকা জুড়ে। তাই, এই উপন্যাস থেকে সিরিয়ালে রূপ দেওয়া একটি জটিল ব্যাপার। তবু আশা রাখছি, ইন্দ্রজিৎ, বাচ্চুরা এটা করে উঠতে পারবে”।

বিষয়টি নিয়ে খবরও প্রকাশ হলো জাতীয় দৈনিকে

পরের দিন সকালে দৈনিকগুলোতে ‘পূর্ব-পশ্চিম’ হেডলাইন হল। কবি-সাহিত্যিক আর নাট্যকর্মীদের মহলে ‘পূর্ব-পশ্চিম’ আলোচনার একমাত্র বিষয় হতে শুরু করল। ঔৎসুক্য বাড়ল, বাংলাদেশের কোন কোন শিল্পীরা এই প্রযোজনায় থাকতে পারে। সব মিলিয়ে, দুই বাংলার প্রথম ছোটোপর্দার এই যৌথ উদ্যোগকে বাংলাদেশের এক শ্রেণির মানুষরা খুশি মনে নিয়েছিল।

পাশাপাশি, শুরু হল এর বিরুদ্ধাচরণও, যা আগে কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিলাম। ‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাস ও এই ধারাবাহিকটি নিষিদ্ধ করার দাবি উঠল। ঢাকা শহর ও বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় পোস্টার পড়ল ভারতীয় দালাল চিহ্নিত করে। আমার আর বাচ্চুর নামে দুই দেশকে এক করার চক্রান্ত করার ছবি দিয়েও বিভিন্ন প্রান্তে পোস্টার পড়ল (সেই পোস্টারের একটা কপি এখনও খুঁজে যাচ্ছি)।

বলা বাহুল্য, এর কোনোটাকেই খুব একটা পাত্তা দিলাম না সেই সময়। একুশে ফেব্রুয়ারির ভোররাতে ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর প্রথম শট টেকিং-এর পরিকল্পনায় ব্যস্ত হয়ে উঠলাম।

দাবি ওঠে ভারতের বাংলা অংশেও

‘পূর্ব-পশ্চিম’ নিয়ে এপার বাংলাতেও এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সামনে পড়তে হয়েছিল। ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সংঘ’ নামে কোনো এক সংস্থা, যাদের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও আদতে কী তাদের কার্যকলাপ, সেটা বুঝতে একটু সময় লেগেছিল। তৎকালীন এক প্রবীণ, সম্মানীয় ব্যক্তি, যিনি হয়তো পদ্মার ওপার থেকে চলে এসেছিলেন অনেকের মতো, ছিলেন এই সংস্থার কর্ণধার। ঢাকা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলনের পর কলকাতা প্রেস ক্লাবে ‘পূর্ব-পশ্চিম’ নিয়ে এপার বাংলার মানুষকে জানান দেওয়া হয়। সাংবাদিক সম্মেলনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই ‘মৈত্রী’ সংস্থা থেকে ফোন আসতে শুরু করে। আমরা কারা, আমাদের কী উদ্দেশ্য, ভারতকে কীভাবে এই প্রযোজনায় দেখানো হচ্ছে, সেটা কতটা সমীচীন – ইত্যাদি বহু তাদের প্রশ্ন। প্রশ্ন এবং প্রশ্ন করার ভঙ্গিমায় বোঝানোর চেষ্টা, যে দুই বাংলার মানুষের সৌহার্দ্য এবং মৈত্রী বজায় রাখার ঠেকা নিয়ে বসেছিলেন ওরা।

আমি তখন ব্যস্ত বাংলাদেশে একুশে ফেব্রুয়ারির ভোররাতে ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর প্রথম শট নেওয়ার প্রস্তুতিতে। এর মধ্যে বেশ কিছু মজার ঘটনা ঘটতে শুরু করল। ‘পূর্ব-পশ্চিম’ টেলিভিশন প্রযোজনার কথা খবরের কাগজে বেরোনো শুরু করল। অভিনেতা অভিনেত্রীদের ঔৎসুক্য এবং যোগাযোগ চালু হতে লাগল। প্রায় প্রত্যেকেই এসে তাদের মা-বাবাদের ওপার বাংলার বসতভিটের কথা, বাড়িতে এখনও পূর্ববঙ্গীয় ভাষায় কথা বলা, আর যা যা বাঙালপনায় তারা দিন কাটায় তার কথা বলা শুরু করতে লাগল। যেন, অভিনয় পারদর্শিতা অতটা প্রধান নয়, আমি কতটা বাঙাল, সেটাই একমাত্র সূচক ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এ জায়গা পাওয়ার। বলা বাহুল্য, মনে মনে খুশি হলাম যে, হয়তো বা এই প্রযোজনা কিছু মানুষকে তাদের শিকড়ের খোঁজে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিল। ওই সময়কার প্রায় সমস্ত স্বনামধন্য অভিনেতা-অভিনেত্রীদের উৎসাহ ব্যক্তিগতভাবে আমাকেও আবেগতাড়িত করেছিল। শিল্পী-কলাকুশলীদের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু হল।

১৯৯২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের সামনে ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর মহরত

কলকাতা থেকে হাইব্যান্ড ক্যামেরা, সঙ্গে পুনা ইনস্টিটিউট থেকে সদ্য স্নাতক এবং এই মুহূর্তে ভারতবর্ষের প্রথম সারির সিনেম্যাটোগ্রাফার অমিত সেন, সহযোগী পরিচালক মিলন রায়চৌধুরী-সহ প্রায় আটজন বাসে এবং পরবর্তীকালে লঞ্চে করে পদ্মা পেরিয়ে ঢাকা পৌঁছলাম। একুশের ভোররাতে ঢাকার শহিদ মিনারে ‘পূর্ব-পশ্চিম’ টেলিভিশন প্রযোজনার প্রথম শট। তখনকার সময় হ্যান্ডক্রেন জাতীয় কোনো উঁচু থেকে শট নেওয়ার যন্ত্রপাতি বাজারে আসেনি। বাংলাদেশে তো নয়ই। তাই, প্রথম শট অমিতকে মিলনের ঘাড়ে তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হল। শহিদ বেদিতে একুশের ভাষাশহিদদের সম্মান জানানো ছিল দুই বাংলার টেলিভিশন সিরিজ ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর প্রথম শট। দু’দিন ঢাকা থাকার পর সকলে কলকাতা ফিরলাম। কংগ্রেস আমলের তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী শ্রী অজিত পাঁজার মন্ত্রক থেকে একটা চিঠি এল। চিঠিতে লেখা, “দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে ‘পূর্ব-পশ্চিম’ প্রযোজনা আপাতত বন্ধ রাখা হোক। পরবর্তী সময়ে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে”। খবর নিয়ে জানলাম, সেই ‘মৈত্রী’ সংস্থার কোনো অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার থেকে এহেন নির্দেশ।

কেউ জানলো না কিছু

বাংলাদেশের ‘পূর্ব-পশ্চিম’ নিষিদ্ধ করার আর কলকাতায় ‘পূর্ব-পশ্চিম’ বন্ধ রাখার মধ্যে যোগসূত্র একটাই – দু’দেশের এই দুই গোষ্ঠীর কেউই জানার চেষ্টা করল না, উপন্যাসটাকে ছোটোপর্দায় কীভাবে রূপান্তর করার পরিকল্পনা। এরকম মানুষ বা এই ধরনের গোষ্ঠী ২০২০তেও আমরা আমাদের আশেপাশে সর্বত্র দেখতে ও শুনতে পাই, ২৭ বছর আগের মানুষগুলোর সঙ্গে এদেরও কোনো তফাত খুঁজে পাই না।

স্বভাবতই, মনটা কিছুদিনের জন্য হলেও একটু দমে গিয়েছিল। কিন্তু, ওই যে প্রথমে জানিয়েছিলাম, নিজের অসীম ধৈর্য এবং রক্তে বাঙালপনার ওপর ভরসা রেখে সুনীলদাকে বলেছিলাম, “সুনীলদা, চিন্তা করবেন না, আমি আমার শেষ নিঃশ্বাসের আগে এই ‘পূর্ব-পশ্চিম’ শেষ করব”।

দীর্ঘ দশ বছর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বহু রকমের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সুনীলদাকে দেওয়া সেই কথাটাই মনে ঘুরপাক খেত।

২০০১ সালে ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর পুরো দমে শুটিং চালু করলাম। বাংলাদেশে তখনও খালেদা জিয়া সরকার, ভারতবর্ষে তখন অটল বিহারী বাজপেয়ী সরকার। বাংলাদেশে সেই মৌলবাদী ‘ভারতীয় দালাল প্রতিরোধ কমিটি’-র বাহিনী। আর কলকাতায় ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সংঘ’-র রমরমে বাজার। দশ বছর পর এদের কারুরই কোনো হেলদোল ছিল না। এরই মধ্যে চালু হল ‘পূর্ব-পশ্চিম’। সুনীলদাকে দেওয়া কথা রাখতে পারলাম।

মিলন রায় চৌধুরীর ঘাড়ে উঠে প্রথম শট নিচ্ছেন অমিত সেন, পাশে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ (বাচ্চু)

এরপর….

বাংলাদেশের ‘ভারতীয় দালাল প্রতিরোধ কমিটি’-র ‘পূর্ব-পশ্চিম’ নিষিদ্ধ করার দাবি এবং পরবর্তীকালে ভারত সরকারের নির্দেশের অভিঘাতে আপাতত প্রযোজনা প্রক্রিয়া বন্ধ রাখলাম। কত দিন পরে আবার নতুন করে এই প্রযোজনা শুরু করা যায়, সেই ভাবনা যদিও বন্ধ হল না। আগেই লিখেছিলাম, ইতিমধ্যে কলকাতার প্রায় সব স্তরের কলাকুশলীরা যোগাযোগ করা শুরু করেছিলেন। যেমন সব ক্ষেত্রেই করে থাকেন। তফাতটা এই যে, যাঁরা এই প্রযোজনায় পার্ট চাইছিলেন, তাঁরা বা তাঁদের পরিবার কোনো না কোনোভাবে ওপার বাংলার সঙ্গে জড়িত। কলাকুশলীদের মধ্যে এই ভাবনাটা কোনো কারণে ঢুকে পড়েছিল যে, এই প্রযোজনা কেবলমাত্র পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যাঁদের আত্মিক যোগ, তাঁদেরকে নিয়েই করা হবে। এমনও হয়েছে, যাঁদের সঙ্গে ওপার বাংলার কোনো সম্পর্কই নেই, যাঁদের জন্ম-কর্ম-বেড়ে ওঠা কলকাতায়, তাঁরা কিছুটা হলেও ইতঃস্তত করছিলেন পার্ট চাইতে।

তারই পাশাপাশি টেলিভিশন মাধ্যমে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেওয়া শুরু করেছিলাম। ১৯৯০ সালে ইতালিতে দেড় মাস ধরে থেকে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে একটা সম্পূর্ণ অন্যরকম সিরিজ দূরদর্শনের জাতীয় চ্যানেলে সম্প্রচার করলাম। কলকাতা থেকে ৬ জন কারিগরি সহায়ক নিয়ে বিপুল পরিমাণ যন্ত্রপাতি ইতালির রোম শহরের একটা হোটেল রুমে সেট আপ করানো হল। সেখান থেকে প্রত্যেক দিন স্যাটালাইটের মাধ্যমে ‘বিশ্বকাপ ইটালিয়া নাইনটি’-র সমস্ত খবরাখবর, ফিচার, ভারতে পাঠানো হত। আমাদের সংস্থাকে ফিফা এশিয়ার প্রথম বেসরকারি সংস্থা হিসেবে বিশ্বকাপের ঘটনা (Sidelights Italia 90) কভার করার অনুমতি দিয়েছিল। জুরিখে ফিফার সঙ্গে ফিফা হাউজে তৎকালীন সেক্রেটারি সেপ ব্লাটারের উপস্থিতিতে MOU স্বাক্ষর করেছিলাম পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ফিফা পরিচালিত ওয়ার্ল্ডকাপের ঘটনা কভার করার এক্সক্লুসিভ স্বত্ব চেয়ে। সেই সুবাদে আমরা ১৯৯১ সালের নভেম্বর মাসে দক্ষিণ চিনের ওয়াংঝাও শহরে প্রথম ফিফা উইমেনস ফুটবল ওয়ার্ল্ডকাপ কভার করি। ‘দর্পণ’ নামে বাংলা টেলিভিশনের প্রথম নিউজ কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স সিরিজও চালু করি আমরা। ১৯৯৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম আলোচনা-সহ সরাসরি সম্প্রচারের জন্য প্রযোজনাও করেছি। প্রথম ইটালিয়ান সকার এবং ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ দেখানোর ব্যবস্থা করি বাংলার অগণিত ফুটবলপ্রেমীদের জন্য। এরকমই নানাভাবে ছোটোপর্দার সঙ্গে নন-ফিকশন প্রযোজনায় দিন, মাস, বছর কাটতে থাকে। কিন্তু, সুনীলদাকে দেওয়া কথা, ভিতরের বাঙালপনা, সব মিলিয়ে এত সবের মধ্যেও ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর বেড়াজাল থেকে বেরোতে পারিনি।

চিন্তার মধ্যে থাকত, উপন্যাসের প্রধান দুই চরিত্র প্রতাপ আর মামুন কারা টেনে নিয়ে যেতে পারবে। মনের মতো অভিনেতা পাওয়া যাবে তো? উপদেশের বন্যা আসতেই থাকত। কিন্তু, ঠিক মনের মতো হচ্ছিল না। আর যেহেতু আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো স্টারডমে বিশ্বাস করি না, তাই, বাংলা সিনেমা ও টেলিভিশন জগতে পরিচিত এবং পপুলার মুখগুলো আমাকে খুব একটা উৎসাহ দিতে পারেনি। অসংখ্য ছবি আর অনুরোধ আসা শুরু করল। বাংলাদেশের থিয়েটারকর্মী বন্ধুবান্ধবদের কাছে বলা ছিল, উপন্যাসের চরিত্র অনুযায়ী কোনো সাজেশন থাকলে যেন জানায়। বাংলাদেশের চরিত্র কেবল বাংলাদেশি অভিনেতা-অভিনেত্রীরাই করবে, আর এপারের চরিত্ররা কেবলমাত্র টালিগঞ্জের কলাকুশলীদের মধ্যে সীমিত থাকবে, এই ভাবনা থেকে প্রথম বেরিয়ে এসেছিলাম আমরাই। তাই হয়তো, মামুনের মতো একটা চরিত্রের জন্য নাট্য অভিনেতা বিমল চক্রবর্তীকে নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছিল। ইচ্ছে ছিল, জেলার নাটকের দলের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের এই প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত করার। সেই মতো, শান্তিপুরের কিছু নাটকের দল, বহরমপুর রেপার্টারি-সহ আরও বেশ কিছু জেলাস্তরের দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন হচ্ছিল।

২০০০ সালে এক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে পূর্ব পরিচিত একজন প্রোগ্রাম ইনচার্জ হয়ে যোগ দেয়। সে জানত ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর ইতিকথা। তার থেকেও বেশি বুঝত ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর মতো একটা প্রযোজনার গুরুত্ব।

ঠিক ১০ বছর পর আবার শুরু হল এই প্রযোজনার প্রক্রিয়া। বেসরকারি চ্যানেল থেকে অনুমতিপত্র এল। প্রথমে সুনীলদার কাছে গিয়ে সেটা জানালাম। বলা বাহুল্য, স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় বললেন, “বাঃ, তাহলে এবার শুরু করে দাও”।

পরিকল্পনা ছিল, ‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাস ঠিক যেভাবে শুরু হয়েছিল, ঘটনাপ্রবাহে যে জায়গাগুলোর উল্লেখ ছিল, সেখান থেকে কোনোরকম বিচ্যূতি করব না। উপন্যাসের শুরুতেই ছিল, প্রতাপ তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে শিমুলতলার দিকে ছুটি কাটাতে যাচ্ছে। কলকাতার যে কোনো জায়গায় সেটা শুট করতেই পারতাম, যেমন আর সব ছোটোপর্দার, এমনকি বড়োপর্দার প্রযোজনায় হয়ে থাকে। কিন্তু, ওই যে আগেই বললাম, উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ থেকে বেরোব না। তাই, ট্রেনে করে বাক্স-প্যাটরা, ছেলেমেয়ে-সহ শিমুলতলা পৌঁছনো এবং শিমুলতলায় শুটিং দিয়েই শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি লেখকের একান্তই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে লেখা।

একটি মন্তব্য করে যান

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন