বোকা বাক্সের নস্টালজিয়া যুগ

বোকা বাক্স এখনও বোকাই রয়ে গেল, শুধু পাল্টেছে আকৃতি

বাংলাদেশে একটা সময় একটাই চ্যানেল ছিল। সেটি হল ৯ নম্বর চ্যানেল। এটাতে কেবলমাত্র বাংলাদেশ টেলিভিশন অর্থাৎ বিটিভি দেখা যেত। এরপর বেশি কিছুদিন পর চালু হলো ৬ নম্বর চ্যানেল; সেটাও বিটিভি!

তখন টিভি ছিল ঢাউস একটি বড় বাক্সের মত। যার কাঠামোর অনেক অংশই কাঠের তৈরি থাকতো। টেলিভিশনের পেছনে কাঠের কভারের ফুটো দিয়ে কিছু বাল্ব জ্বলতে দেখা যেত। টিভিগুলোর পায়াও থাকতো! রুমের এক মাথায় টিভি দাঁড়িয়ে থাকতো তার কাঠের চার পায়ে ভর দিয়ে। রিমোট কন্ট্রোল তখন ছিল না। শীতকালে লেপ-কম্বল গায়ে দিয়ে আয়েস করে বসে টিভি দেখার উপায় ছিল না! সাউন্ড বা আলো কমাতে-বাড়াতে হলে উঠতে হতো।

তখনকার টিভিতে সিগারেটের বিজ্ঞাপন দেখানো সাধারণ একটি ব্যাপার ছিল। ছিল না কোনো সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ। অনেকদিন কেবলমাত্র সাদা কালো টেলিভিশনই ছিল। অনেক পরে রঙিন টেলিভিশন দেখে দেশের মানুষ মুগ্ধ হয়েছিল।

সেই সময়ে টেলিভিশনে যারা খবর পাঠ করতেন, তাদের অনেক কষ্ট করতে হতো। এক নাগাড়ে ২০-৩০ মিনিট কাগজের লেখা খবর পড়তে হতো। এক পৃষ্ঠা পড়া হলে তা পাশে রেখে আবার নতুন পৃষ্ঠার খবর পড়তো। বিজ্ঞাপনগুলোও থাকতো লিখিত আকারে। যেন একটি ল্যান্ড স্কেপ কাগজের পোস্টার। এড চেঞ্জ হওয়ার সময় টুট করে একটি শব্দ হতো।

নব্বই দশকের বোকা বাক্সের চাহিদা তো আরও বেড়ে গেল! সন্ধ্যায় মানুষ ঘরে ফেরে। ঘরে একটা টেলিভিশনের সেট। বোকাবাক্সটাকে মধ্যমণি করে লোকে পরিবারসহ আয়োজন করে বসে পড়ে টিভির সামনে। সন্ধ্যাগুলোতে তারা একসাথে সময় কাটায়, টিভির পর্দায় নাট্যকারের চরিত্ররা হাসে, আর এপাশে এক ঘর ভর্তি হয় গোটা পরিবারের ঝলমলে খুশিতে। নাট্যকার কাঁদায় গল্পের নাটকীয়তায়, লোকে অকারণে চোখের জল ফেলে। সে এক অদ্ভুত সময়।

আজ রবিবার – স্মৃতি হাতড়ে খোঁজা আমাদের এক নস্টালজিয়া

বাংলাদেশে টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয় ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া ‘এই যে আকাশ নীল হলো আজ / এ শুধু তোমার প্রেম’ গানটি সম্প্রচারের মধ্য দিয়ে। দিনটি ছিল ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর। সে সময় অনুষ্ঠান সম্প্রচার হতো ডিআইটি ভবন, বর্তমানের রাজউক ভবন থেকে। নাম ছিল পাকিস্তান টেলিভিশন কর্পোরেশন। দেশ স্বাধীন হবার পর নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ টেলিভিশন।

এরপর যদি কিছু মনে না করেন, চতুরঙ্গ, আপনার ডাক্তার, হারজিত, সপ্তবর্ণা, আনন্দ মেলা, নতুন কুঁড়ি, ভরা নদীর বাঁকে, ইত্যাদি, মাটি ও মানুষ, সংশপ্তক, কোথাও কেউ নেই, আজ রবিবার, বহুব্রীহি, নক্ষত্রের রাতসহ বহু জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ও নাটক দর্শক-শ্রোতাদের উপহার দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই টেলিভিশন চ্যানেলটি। চলতি শতকের শূন্য দশকের প্রায় মধ্যভাগ পর্যন্ত টেলিভিশন নির্ভর বিনোদনের প্রায় পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করতো বাংলাদেশ টেলিভিশন বা বিটিভি।

বিটিভি পৃথিবীতে বাংলা ভাষার প্রথম টেলিভিশন চ্যানেল। সে কারণে বিটিভিকে তো বলতেই পারি বাংলা ভাষার টেলিভিশন চ্যানেলের বাতিঘর। বাংলাদেশে এই যে এতগুলো টেলিভিশন চ্যানেল তার উৎস মুখ তো বিটিভিই। বিটিভি ছিল বলেই দেশে নতুন নতুন টেলিভিশন চ্যানেল সৃষ্টির অনুপ্রেরণা পেয়েছে। এক অর্থে বিটিভি ছিল আমাদের একান্নবর্তী পরিবার। পরিবার বড় হলে সবাই এক সঙ্গে থাকে না। ছেলে-মেয়েরা সংসার সাজিয়ে অন্যত্র চলে যায়। একটি পরিবার থেকে অনেক পরিবারের জন্ম হয়। টেলিভিশনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশেও তেমনটাই ঘটেছে। একটা সময় বিটিভি ছিল আমাদের একটাই টিভি চ্যানেল অর্থাৎ একান্নবর্তী পরিবার।

সময়ের বিবর্তনে সেই পরিবার থেকে সৃষ্টি হয়েছে একাধিক পরিবার। নব্বই দশকের শেষের দিকে সেসময়ের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার বেসরকারি খাতে স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমোদন দিলে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। সত্তরের দশকে সারা দেশে যেখানে হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি টিভি সেট ছিল, বর্তমানে সেখানে ক্যাবল নেটওয়ার্কে যুক্ত টিভি সেটের সংখ্যাই প্রায় ৪ কোটি।

এরপর একে একে একাধিক বেসরকারি টিভি চ্যানেলের জন্ম। কিন্তু বিটিভির অবদানের কথা কি আমরা সবাই স্মরণ করি? দেশের প্রায় প্রতিটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে নেতৃত্ব পর্যায়ে যারা দায়িত্ব পালন করছেন তাদের অনেকেই একটা সময় বিটিভিতে কাজ করেছেন। বিটিভির অভিজ্ঞতাই নতুন টেলিভিশন চ্যানেল করার অনুপ্রেরণা ছিল তাদের কাছে।

নব্বই দশক থেকে চ্যানেলটির দর্শকপ্রিয়তায় অনেকটা ভাটা পড়ে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও দেশের একমাত্র টেরিস্ট্ররিয়াল চ্যানেল হওয়া সত্ত্বেও দর্শকের পছন্দের তালিকা থেকে নাম ছিটকে পড়েছে বিটিভির। কিন্তু তারপরও বিটিভি মানেই বিটিভি!

একটি মন্তব্য করে যান

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন