বাগান শহরের ২১০০ মন্দির ধ্বংস, বাকিটা ‘প্রত্নতত্ত্বের ক্যানভাস’

ক্যানভাস জুড়ে প্রত্নস্থল, বেঁচে আছে প্রায় ২৫০০ মন্দির

এলিজা বিনতে এলাহী

বাংলার ইতিহাস পাঠে আরাকান রাজ্যের কথা আর সাহিত্যে রেঙ্গুন শহরের কথা পড়েননি, এমন কাউকে পাওআ মুশকিল। আমি রেঙ্গুনের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি মূলত শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘ শ্রীকান্ত’ পড়ে। ১৯২৪ সালে বিশ্ব কবিও বর্মী অঞ্চল পরিভ্রমণ করেন। বাংলাদেশের ৬৪ জেলা ভ্রমণ করতে গিয়ে জেনেছি আরাকান রাজ্যের কথা, ব্রিটিশ সরকার দ্বারা শেষ মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ্-র শাস্তিস্বরূপ তত্কালীন রেঙ্গুনে পাঠানো এবং জেনাছি তাঁর সমাধি এখনো রয়েছে রেঙ্গুন শহরে। হাল আমলে মিয়ানমারের কথা নতুন করে মনে উঁকি দেয় আমার ছেলেকে অষ্টম শ্রেণীর বাংলা সাহিত্য কনিকা পড়াতে গিয়ে। পাঠ্যপুস্তকে আজকের মিয়ানমার সম্পর্কে একটি গল্প পাই বিপ্রদাশ বড়ুয়ার লেখা ‘মংড়ুর পথে’।

হুমম, বলছি বর্তমান মিয়ানমার ও তৎকালীন বার্মার কথা। রেঙ্গুন শহরের নাম বদলেও হয়েছে ইয়াঙ্গুন। মিয়ানমার ভ্রমণের প্রধান দুটি কারণের একটি হলো ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত বাগান শহরের প্রায় ২৫০০ মন্দির, আর ইয়াঙ্গুন শহরে বাহাদুর শাহ্-র সমাধি দেখা।

বাগান শহরে এগার থেকে তের শতকের ভেতর ৪৬০০ মন্দির নির্মিত হয়। শুনলেই কেমন লাগে! মন্দিরের শহর তো কতই দেখেছি! দুনিয়ার বুকে আমার প্রথম মন্দিরের শহর দেখা কাঠমুণ্ডুকে। তারপর একে একে শ্রীলংকা, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, থাইল্যান্ডের নানা মন্দির দেখা হয়েছে। তবুও কেন যেন, সংখ্যাটা আমাকে ঘোরের মধ্যে ফেলে দেয়। ৪৬০০-এর মধ্যে নানা প্রতিকুলতায় এখনো বেঁচে আছে প্রায় ২৫০০ মন্দির। ২১০০ মন্দিরই ধ্বংস হয়ে গেল! মূল চত্বরে যাবার আগে রাস্তার দু’ধারে অসংখ্য মন্দির পার হয়ে যেতে হয়। এর মধ্যে এতো বৈচিত্র্যপূর্ণ মন্দির যে, কোন পাশ ছেড়ে কোন পাশ দেখবো ভেবে পাই না। একটু পর পর মনে হচ্ছিল গাড়ি থেকে নেমে দেখি। কিন্ত তা সম্ভব নয়, কারণ গাড়ি একটি নির্দিষ্ট স্থানে রেখে তবেই যেতে হবে। গাড়ি নিয়ে এ মন্দিরের শহরে প্রবেশ নিষেধ।

মন্দিরের এই মিছিল দেখার উপায় আছে চারটে, বাইক ভাড়া করা, হাঁটা, ঘোড়ার গাড়ি আর হট এয়ার বেলুনে করে উপর থেকে পুরো চত্বর দর্শন। ঘোড়ার গাড়ি বা হট এয়ার বেলুনের বাজেট নেই আমার। বাইকে যেতে ইচ্ছে করছিল না, পথে বেশ ধুলো আর আমার ছিল হালকা জ্বর। তাহলে বাকী থাকলো শুধু চরণযুগল। ৬ ঘণ্টা সময়, তার মাঝে যতটুক দেখা যায়। ঘুরে ঘুরে দেখতে পেলাম এখানে চার ধরনের স্থাপনা আছে- প্যাগোডা, স্টুপা, মন্দির, মনাস্ট্রি। আমি ভালো করে ঘুরে দেখেছি ৬টি স্থাপনা।

এর একটি আনন্দ মন্দির। এর নির্মাণকাল ১২শ শতক। এটি বাগানের মন্দিরগুলির মধ্যে সেরা, বৃহত্তম, সংরক্ষিত এবং সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় হিসাবে পরিচিত। আনন্দ মন্দিরে বৌদ্ধের চারটি স্ট্যান্ডিং স্ট্যাচু আছে- কাসপা, কাকুশন্ধ, কোনাগমন এবং গৌতমা। থটবইনইউ মন্দিরও প্রায় কাছাকাছি সময়ের। প্রায় সবগুলো মন্দিরের নির্মাণকাল গবেষকরা মনে করছেন ১১ থেকে ১৩ শতকের মধ্যে। গাওদাওপালিন মন্দির মনে করা হয়, নির্মিত হয়েছিল ১৩শ শতকে। গাওদাওপালিন একটি দ্বিতল মন্দির। ধম্মায়ঙ্গি মন্দিরটি বাগানের সর্বাধিক বিশাল কাঠামো বলা চলে। আনন্দ মন্দিরের অনুরূপ স্থাপত্য পরিকল্পনা রয়েছে এই মন্দিরের। মন্দিরটির পশ্চিমদিকের দেয়ালে গৌতম ও মৈত্রেয়ের দুটি ম্যুরাল আছে, যেগুলো ১৩শ শতকের মনে করা হয়। সুলামণি গুফায়া মন্দির সপ্তম শতাব্দীর শেষদিকে নির্মিত বাগানের অন্যতম প্রধান মন্দির। এই মন্দিরের নামের অর্থ ‘ক্রাউনিং জুয়েল’ বা ছোট রুবি। এটি আসলে একটি মন্দিরের চেয়েও বেশি কিছু , কারণ এখানে একটি বক্তৃতা এবং অধ্যয়ন হল, সন্ন্যাসীদের জন্য কোষ এবং গ্রন্থাগারসহ প্রচুর বিল্ডিং ছিল। শ্বেজিগন একাদশ শতাব্দিতে বাগানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাসনালয় হিসাবে নির্মিত হয়। এটি নতুন থেরবাদ বিশ্বাসের প্রার্থনা ও প্রতিচ্ছবি কেন্দ্র।

মূল চত্বরে যাবার আগে রাস্তার দু’ধারে অসংখ্য মন্দির পার হয়ে যেতে হয়

নির্মাণশৈলী বিবেচনায় প্রতিটি মন্দির আলাদা। যেগুলো আজও আধুনিক স্থপতিদেরও ভাবনার খোরাক। ঘুরে ঘুরে কতগুলো শেষ পর্যন্ত দেখতে পেরেছি, তার পরিসংখ্যান আর মাথায় নাই। তবে ৩৩ ডিগ্রী রোদ মাথায় নিয়ে পরিদর্শন শেষ হবার পর শরীর জানান দিচ্ছে জ্বরের কথা। মন্দিরগুলোর ভেতরে পাথরের উঁচু নিচু হাঁটার পথ, কোথাও কোথাও ক্ষয়ে যাওয়ার কারণে বা দীর্ঘ দিন টুরিস্টদের পদধুলিতে কিছু কিছু জায়গা খানিকটা সুচালো হয়ে গেছে। তাতে পা পড়লে তীব্র ব্যথা অনুভব হয়। বুদ্ধের অনুসারীরা ২০০ বছর ধরে এই মন্দিরগুলো বানিয়েছে। তারা তখন কি ভেবেছিলেন হাজার বছর পরও পৃথিবীর নানাপ্রান্ত থেকে মানুষ ডলার, পাউন্ড খরচ করে এগুলো দেখতে আসবে!

সকাল থেকে ঘুরে ঘুরে দুপুর গড়িয়ে গেল। ক্ষুধায় ত্রাহি অবস্থা। রেস্টুরেন্টের সন্ধান দিলেন আমার গাইড। খাবারের সে জায়গা এতোই মুগ্ধকর যে, সব ক্লান্তি নিমিষেই উবে গেলো। বাগান শহরে এই রিভার ফ্রন্ট রেস্টুরেন্টটি মিয়ানমারের সবচেয়ে দীর্ঘ নদী ইরাবতীর সামনে একদম। বাগান শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে এর একটি শাখা।

মন্দির দেখা শেষ হলো। বিকেলে বাগান শহরের গ্রামীণ জীবন দেখতে বের হলাম। আমি সত্যিই অভিভূত হয়েছি, ছোট ছোট গ্রামের গৃহিণীদের দেখতে পাই পর্যটনের সঙ্গে কী নিপুনভাবেই না যুক্ত হয়েছে। কমিউনিটি ট্যুরিজমের এক দারুণ দৃষ্টান্ত দেখতে পাওয়া যায় বাগান শহরে। গাইড সেখানকার এক মধ্য বয়সী মহিলার কাছে আমাকে সঁপে দিলেন। এরপর সেই মহিলা আমাকে নিয়ে পুরো গ্রাম ঘুরে দেখালেন। তারা কী করে

নিজেদের কাপড় নিজেরাই বুনছে , ফসল তুলে কীভাবে সেগুলোকে খাবার উপযোগী করে তুলছে নিজেদের বাড়ির ভিতরেই। তিলের চাষ, নানা জাতের, নানা রঙের ভুট্টার চাষ নিজেরাই করছে। বাড়িগুলোতে স্যুভেনির শপও রয়েছে। গাইড মহিলা আমাকে জানালো সরকারিভাবে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, পর্যটকদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হবে, বা কীভাবে তাদের সঙ্গ দিতে হবে। প্রায় ২ ঘন্টা সময় তার সঙ্গে কাটিয়েছি, সেই পুরো সময়টাতে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে আমাদের কথোপকথন হয়েছে।

আমি বিস্মিত হয়েছি। আগ্রহ আর সদিচ্ছা থাকলে পর্যটনকে অন্যরকম এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যায়। আর বাগান শহর সমপর্কে কেউ যদি আমার কাছে জানতে চায় আমি আসলে এক লাইনে বলবো এ যেন এক ‘প্রত্নতত্ত্বের ক্যানভাস’।

লেখক: বাংলাদেশি পরিব্রাজক

একটি মন্তব্য করে যান

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন