বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো নারীর ফাঁসি কার্যকর হয়নি

সর্বশেষ বরগুনার আলোচিত শাহনেওয়াজ শরীফ ওরফে রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তার স্ত্রী মিন্নিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত

স্বাধীনতার পর প্রায় অর্ধশত বছর কেটে গেলেও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত নারী আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি।

কারা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযোগে দেড় শতাধিক নারীর ফাঁসির আদেশ হলেও আজ পর্যন্ত কারও ফাঁসি কার্যকর করা হয়নি। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে অনেকেই দীর্ঘদিন কারাভোগ করে বিশেষ ক্ষমা পেয়ে বেরিয়ে গেছেন, কেউবা কারাগারেই স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন। কারও আবার উচ্চ আদালতে আপিল করে শাস্তি কমেছে।

সর্বশেষ বরগুনার আলোচিত শাহনেওয়াজ শরীফ ওরফে রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তার স্ত্রী মিন্নিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ রায় ঘোষণার পর সবার মনে তাই মিন্নির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, নারী আসামিদের ক্ষেত্রে আপিল বিভাগে যাওয়ার পর ফাঁসির রায় আর বহাল থাকে না। সাধারণ কারাবিধি অনুযায়ী ফাঁসি কার্যকরের ক্ষেত্রে তিনি বয়স্ক কিনা, তার শারীরিক অসুস্থতা আছে কিনা, আসামি গর্ভবতী কিনা এবং সর্বোপরি তিনি যদি নারী হন- এসব বিবেচনায় তার মৃত্যুদণ্ড হ্রাস ও স্থগিত করা হয়। ইতিহাস বলছে, ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত নারী আসামিদের মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে সাজা কমিয়ে দেয়া হতো। এ বিষয়ে অলিখিত প্রথা ছিল।

কারা অধিদফতর সূত্র জানায়, সারাদেশে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসামি রয়েছেন গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে। এখানকার কনডেম সেলে বর্তমানে প্রায় ৫০০ জন ফাঁসির আসামি রয়েছেন। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধশতাধিক নারী।

কারা সূত্রে জানা গেছে, ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত নারী আসামিদের মধ্যে কেউ কেউ দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে কনডেম সেলের বাসিন্দা। তাদের ফাঁসির রায় দীর্ঘদিন আগে হলেও তা কার্যকর হয়নি। দণ্ডপ্রাপ্ত নারী আসামিদের মধ্যে সবাই হত্যার দায়ে ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত। পরিবারের কোনো সদস্যকে হত্যার কারণেই এদের অধিকাংশকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। উচ্চ আদালতে আপিল শুনানির পর ফাঁসির দণ্ড থেকে দণ্ডপ্রাপ্ত অনেককেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।

রিফাত হত্যা: মিন্নির মৃত্যুদণ্ড

বরগুনার আলোচিত শাহনেওয়াজ শরীফ ওরফে রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির মধ্যে ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। এ সময় বাকি চার আসামিকে খালাস দেয়া হয়েছে।

বুধবার বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করার কথাও বলে হয়েছে। রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত চত্বরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- মৃত্যুদণ্ড- আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি, রাকিবুল হাসান রিফাত ফরাজি, আল কাইয়ুম ওরফে রাব্বি আকন, মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত, রেজওয়ান আলী খান হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয়, মো. হাসান। খালাস পেয়েছেন- রাফিউল ইসলাম রাব্বি, মো. সাগর, কামরুল ইসলাম সায়মুন, মো. মুসা।

এর আগে, সকাল ৯টায় বাবা মোজা‌ম্মেল হক কি‌শোরের সঙ্গে মিন্নি আদালত প্রাঙ্গণে আসেন। এরপর কারাগার থেকে ৮ আসামিকে নেয়া হয় আদালতে।

কে কী বললো

রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান বাবু বলেন, রিফাত হত্যা মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। তাই প্রত্যাশিত রায় পেয়েছি। রায়ে প্রমাণ হলো অপরাধী যেই হোক ছাড় নেই। এ মামলার রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

রায় ঘোষণার পর রিফাতের বাবা বলেন, আমি ও আমার পরিবারের সবাই এ রায়ে অত্যন্ত খুশি হয়েছি। আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাই। সংশ্লিষ্ট সবাই এ মামলার বিচারকাজ আন্তরিকভাবে করেছেন। সেজন্য আমার ও আমার পরিবারের পক্ষ থেকে সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছ ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

রায় দেয়ার পর মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, আমরা আদালতে সঠিক রায় পাইনি। আমরা উচ্চ আদালতে যাবো।

ঘটনার শুরু

২০১৯ সালের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে নয়ন বন্ড ও তার সহযোগী সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে রামদা দিয়ে কুপিয়ে রিফাত শরীফকে গুরুতর আহত করে। এরপর বীরদর্পে অস্ত্র উঁচিয়ে এলাকা ছাড়েন তারা। গুরুতর আহত রিফাত বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওইদিনই মারা যান।

ওই বছরের ১ সেপ্টেম্বর রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় রিফাতের স্ত্রী মিন্নিসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চার্জশিট দেয় পুলিশ। একইসঙ্গে রিফাত হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ায় তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি রিফাত হত্যা মামলার প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালত। ৮ জানুয়ারি একই মামলার অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে বরগুনার শিশু আদালত। এ মামলার চার্জশিটভুক্ত প্রাপ্তবয়স্ক আসামি মো. মুসা এখনো পলাতক রয়েছেন।

একটি মন্তব্য করে যান

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন