ফেনী সরকারি পাইলট হাই স্কুল: দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার প্রাচীন বিদ্যাপীঠ

লম্বা-লম্বিভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটি ফেনী সরকারি পাইলট হাই স্কুলের; পাশেই ফেনী সরকারি কলেজ

প্রাচীর পেরোলেই সবুজ মাঠ। যতটুকু মাঠ, ঠিক ততটুকুই লম্বা-লম্বিভাবে দাঁড়িয়ে আছে একটি লাল দালান। খুব বেশি উঁচু নয়, দোতলা। যে কেউ দালানের দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করতে পারবে- এটি অনেক পুরনো। এই দেয়ালের প্রতিটি ইট যে আলাদা আলাদা গল্প ও নানান ইতিহাসের সাক্ষী—তা ফেনী শহরের প্রতিটি মানুষই জানেন।

বলছিলাম দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার প্রাচীন বিদ্যাপীঠ ফেনী সরকারি পাইলট হাই স্কুলের কথা। ১৮৮৬ সালে বঙ্গোপসাগর বিধৌত দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার সবুজ শ্যামলীমায় ঘেরা ফেনী জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এ বিদ্যাপীঠটি। এরইমধ্যে স্কুলটির ১’শ ৩৪ বছরে পা রেখেছে। এ শিক্ষালয় থেকে শিক্ষা লাভ করে অনেকেই হয়েছেন বরেণ্য। শুধু বাংলাদেশ নয় উপ-মহাদেশের অনেক বরেণ্য ব্যক্তি এ বিদ্যাপীঠে অধ্যয়ন করেছেন। অবিভক্ত বাংলার প্রথম শিক্ষামন্ত্রী হুময়ুন কবিরও ছিলেন এ স্কুলটির কৃতি ছাত্র।

সেকালের গল্প

তৎকালীণ মহকুমা প্রশাসক পলাশীর মহাকবি নবীনচন্দ্র সেন বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। নাম দেন ‘ফেনী হাই স্কুল’। পাকিস্তান আমলে পুরো দেশে উল্লেখযোগ্য কয়েককটি স্কুলকে ব্রিটিশ শিক্ষা প্রকল্প ‘পাইলট প্রজেক্টের’ আওতায় আনা হয়। এর মধ্যে ফেনী হাই স্কুলও অন্তর্ভূক্ত ছিল। পাইলট প্রজেক্টের আওতায় সকল স্কুলের নামের সঙ্গে ‘পাইলট’ যুক্ত হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সনের ১৫ আগস্ট বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হয়।

নবীণচন্দ্র সেন তার আত্মজীবনীতে প্রসঙ্গক্রমে বলেন, ‘বাহিরে ভিক্ষা করিয়া চারি শত টাকা মাত্র পাইলাম।’ এভাবে টাকা সংগ্রহ করে একটিমাত্র মাইনর স্কুলকে এন্ট্রান্স স্কুলে রূপান্তরিত করেন তিনি। বলা হয়ে থাকে, নবীণচন্দ্র সেন এ জনপদের শিক্ষাবিমুখ সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন বর্তমান ফেনী পাইলট হাই স্কুল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।

ফেনী সরকারি পাইলট হাই স্কুলের প্রবেশদ্বার

বিশ্বযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ প্রেক্ষাপট

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় স্কুলটি ব্রিটিশ আর্মি ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন জাপানিরা এই স্কুলের উত্তর পাশের লাল রঙের মূল ভবনটিতে বোমা ফেলেন। ফলে ভবনটি আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। প্রয়াত কবি গোলাম মোস্তফা ভূঞাঁ স্কুলের ১’শ ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত ম্যাগাজিন লন্ঠনে লিখেন, ‘১৯৩৯ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে আমাদের স্কুল ১০৯৪ সাল পর্যন্ত বন্ধ ছিল। প্রায় ৬ বছর স্কুলে শিক্ষা কার্যক্রম চলেনি। ১৯৪৬ সালে পুনরায় শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়।’

তিনি আরো লিখেন, ‘পরবর্তীতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েও এটি পাক আর্মি ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এসময় স্কুলের গুরুত্বপূর্ণ অনেক নথিপত্র ধ্বংস হয়। পাক আর্মি ওইসময় স্কুলটিকে টর্চার সেলে পরিণত করেছিল। স্কুলের উত্তর-পূর্ব দিকে একটি অচিহ্নিত গণকবর রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পাশে ছাত্রাবাসের পাশে জলাপূর্ণ স্থানটিতেও গণকবর রয়েছে। ১৯৭১ সালে নিহতদের স্মরণে স্কুলের পূর্ব প্রান্তে একটি স্মৃতিস্তম্ব রয়েছে।’

স্কুলটি থেকে শিক্ষা নিয়েছেন অসংখ্য বরেণ্য

ফেনী সরকারি পাইলট হাই স্কুলকে বলা হয় ফেনীর শিক্ষা বিস্তারের পথ প্রদর্শক। প্রতিষ্ঠার পর থেকে অদ্যবধি এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে অনেকেই হয়েছেন বরেণ্য। তাদের মধ্যে রয়েছেন- অবিভক্ত বাংলার প্রথম শিক্ষামন্ত্রী হুময়ুন কবির, মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর উত্তম শহীদ সালাউদ্দীন মমতাজ, বীর বিক্রম জাফর ইমাম, সাহিত্যিক সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকার ওবায়দুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক তিন উপাচার্য ড. একে আজাদ চৌধুরী, আনোয়াল উল্লাহ চৌধুরী ও গিয়াদ উদ্দিন আহমেদ।

এছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কাজী সালেহ আহমেদ, সাবেক মন্ত্রী জিয়া উদ্দিন বাবলু, শিল্পপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু, নাট্যাভিনেতা ইনামুল হক, দুই বাংলার অন্যতম কবি বেলাল চৌধুরী, চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরী, বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, আবদুল আউয়াল, সাবেক সচিব মফিজুর রহমানসহ আরও অনেকেই এই বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।

ফেনী সরকারি পাইলট হাই স্কুলের সবচেয়ে পুরনো ভবন, যেটাকে এই লেখায় ‘লাল ভবন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে

সেই জৌলুস এখনও আছে?

ফেনীর শিক্ষা বিস্তারে এখনও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। প্রতি বছর জেএসসি ও এসএসসির ফলাফলে এগিয়ে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম এটি। চলতি বছরও এসএসসির ফলাফলে জেলায় সর্বোচ্চ ১৬৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে ফেনী সরকারি পাইটল হাইস্কুল হতে।

প্রধান শিক্ষক হোসনে আরা বেগম জানান, তিন বিভাগের মোট ৩৫৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। পাশের হার ৯৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এছাড়া ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রায় ১৫’শ ছাত্র রয়েছে। এখানে দুই শিফটে ক্লাস করানো হয়।

বিদ্যালয়ের লাল রঙের দ্বিতল মূল ভবনটি এখন পরিত্যক্ত। আগে এটিই ছিল প্রশাসনিক ভবন। এখন পাশের তিনতলা নতুন ভবনটিতে প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয়েছে। এই দুই ভবনের মাঝে অবস্থান করছে বিদ্যালয়ের একতলা ভবনের মসজিদ। এর ঠিক বিপরীত দক্ষিণ পাশে অবস্থান করছে বিদ্যালয়ের ‘এসেম্বলি হল’। মাঝে রয়েছে বিশাল মাঠ। এসেম্বলি হলের পূর্ব পাশে রয়েছে প্রধান শিক্ষকের বাস ভবন এবং এর পূর্ব পাশে রয়েছে আরেকটি ভবন; নাম ‘বিজ্ঞান ভবন’। এখানেও পাঠ কার্যক্রম চালনা করা হয়। বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসটি রয়েছে প্রধান শিক্ষকের বাস ভবনের দক্ষিণ পাশে।

ফেনীর শিক্ষা বিস্তারে এখনও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি

সংকট ও প্রত্যাশা

শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষকসহ বিভিন্ন সংকটে রয়েছে প্রাচীণ এ বিদ্যাপীঠে। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি দিনদিন অবনতির দিকে যাচ্ছে, এমনটাই মনে করছেন স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা। জেলার ঐতিহ্যবাহী এ স্কুলটিতে দীর্ঘ দিনেও নিরসন হচ্ছেনা শিক্ষক সংকট। একইভাবে ভবন সংকটের কারণে ঠাসাঠাসি করে ছাত্রদের শ্রেণিকক্ষে বসতে হয়। বৃটিশ আমলে নির্মিত পুরনো লাল ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করায় শ্রেণী কক্ষ সংকট দেখা দিয়েছে।

প্রাণের বিদ্যাপীটটি নিয়ে প্রত্যাশার কমতি নেই সাবেক শিক্ষার্থীদের। এসএসসি ১৯৯৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ফেনী জেলা প্রতিনিধি আরিফুল আমিন রিজভী বলেন, ‘সময়ের সাথে ফেনী শহরে আরও স্কুল প্রতিষ্ঠা হয়েছে। তবে এখনও মেধাবী মুখ দেশকে উপহার দিচ্ছে স্কুলটি। তবে অনেক কিছুই নেই আগের মতো। তিন দশক আগের মতো সবুজ মাঠ, শ্রেণিকক্ষে প্রাণবন্ত পাঠদান এখন অনুপস্থিত। প্রত্যাশা রাখবো প্রাণের বিদ্যালয়টি অতীতের মত আরো অনেক বরেণ্য মানুষ গড়ে তুলবে।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হোসনে আরা বেগম বলেন, ‘এ বিদ্যায়টি পুরো জেলার বাতিঘর। জেলায় শিক্ষা বিস্তারে বিদ্যালয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বর্তমানে স্কুলটি শিক্ষক ও শ্রেণী কক্ষের কিছুটা সংকট রয়েছে। যার কারণে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। তবে স্কুলে যে শিক্ষকরা কর্মরত আছেন- সবাই খুবই আন্তরিক। ছাত্র-শিক্ষক সবার প্রয়াসে স্কুলটি প্রতি বছর ভালো ফলাফল করে আসছে। আমরা মনে করি- যে সংকটগুলো আছে, তা কাটিয়ে উঠতে পারলে স্কুলটি আরও ভালো করবে।’

একটি মন্তব্য করে যান

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন