পৃথিবীতে পাঁচ সেকেন্ড অক্সিজেন না থাকলে যা ঘটবে

পৃথিবীতে প্রতিদিনই বন উজাড় হচ্ছে, খুল্লামখুল্লা চলছে অক্সিজেন খুনোখুনি

গাছ কাটো। দামের লোভে। ঝরুক সবুজ রক্ত। শেষ হয়ে যাক অক্সিজেন। বাধা দেওয়ার তো কেউ নেই! তাই তো হচ্ছে! প্রাচীন, অতি প্রাচীন কিংবা সদ্য লাগানো চারা গাছেরও ঠাঁই হচ্ছে না এই পৃথিবীতে। খুল্লামখুল্লা চলছে এই খুনোখুনি। কী দোষ? জীবন দেওয়া? প্রাণভরে অক্সিজেনের যোগান যুগিয়ে যাওয়া? সভ্যতার আদালতে এর শাস্তি হবে না, হলেও আমাদের জানা নেই!

বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেনের কোনো বিকল্প নেই, এই কথাটি কমবেশি আমরা সকলেই জানি। আমাদের অনেকেরই ধারণা কেবল প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্যেই হয়তো অক্সিজেন দরকার। যেমন- এই করোনাকালে অক্সিজেনভর্তি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে দেদারছে। আসলে শুধু প্রাণ নয় বরং এই পৃথিবীর সবকিছুর সাথেই জড়িয়ে আছে অক্সিজেন।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, মাটিকেও ধরে রাখে প্রায় ৪৫ শতাংশ অক্সিজেন। এই অক্সিজেন যদি মাটিতে না থাকে তাহলে মাটি ফেঁটে যাবে। এমনকি অক্সিজেনের অভাবে মাটি হালকা হয়ে ধসতে শুরু করবে। আর মাটি ধসে গেলে আমাদের কারো পক্ষেই টিকে থাকা সম্ভব হবে না।

ধরুন, মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের জন্য পৃথিবী অক্সিজেনহীন হয়ে গেল। কী হবে তখন? হয়তো ভাবতে পারেন, মাত্র পাঁচ সেকেন্ড-ই-তো! কারণ অক্সিজেন ছাড়াই বেশিরভাগ মানুষ থাকতে পারে; অর্থাৎ কমপক্ষে ৩০ সেকেন্ড শ্বাস-প্রশ্বাস না নিয়েও থাকা যায়। মানুষের খুব বেশি অসুবিধা হলেও পৃথিবী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে।

পাঁচ সেকেন্ডের অক্সিজেনহীন অবস্থার কারণেই ভেঙে পড়বে কংক্রিটের স্থাপনা, উল্কার মতোই খসে পড়বে আকাশে উড়তে থাকা প্লেন, ঘটে যাবে পরিবেশের বিশাল বিপর্যয়। নদী ভাঙন হয়ে তা পরিণত হতে পারে সমুদ্রে! পৃথিবীর সব পানি উধাও হবে; অর্থাৎ সব পানি বাষ্পীভূত হতে থাকবে।

পানি কেন বাষ্পীভূত হবে? প্রশ্ন মনে জাগতেই পারে। পানি তৈরি হয় দু ভাগ হাইড্রোজেন এবং একভাগ অক্সিজেন মিলে। এখন যদি হঠাৎ করে পানির মধ্যে থাকা অক্সিজেন নাই হয়ে যায় তবে পড়ে থাকবে শুধুই হাইড্রোজেন। হাইড্রোজেন এককভাবে কেবল গ্যাস এবং যা সবচেয়ে হালকা। হাইড্রোজেন যদি অক্সিজেন থেকে আলাদা হয় তবে মুহূর্তের মধ্যে তা আকাশের দিকে যেতে থাকবে। এমনকি পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশে চলে যাবে।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ২১ ভাগ অক্সিজেন ও ৭৮ ভাগ নাইট্রোজেন। যদিও দেখা যাচ্ছে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের চেয়ে বেশি অংশজুড়ে রয়েছে নাইট্রোজেন। তবুও এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনেকটা একটা ভবনের ফাউন্ডেশনের মতো।

বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেনের কোনো বিকল্প নেই, এমনকি পৃথিবীর টিকে থাকার জন্যও

আমরা ইট বালি এবং সিমেন্টকে একত্র করে দালান তৈরি করি। কিন্তু এই ইট, বালি, কংক্রিট—এদের জমিয়ে রাখে কে বলতে পারেন? এদের জমিয়ে রাখার কাজটা করে অক্সিজেন। এমনকি একটা কংক্রিট ভাঙলে যে ছোট কণা হয়ে যায়, সেইসব কণাকেও একত্র করে রাখে অক্সিজেন। যেই সময় বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন নাই হয়ে যাবে সাথে সাথেই এইসব কংক্রিটের দালান পাউডারের মতো গুঁড়া হয়ে যেতে শুরু করবে।

এই লেখার শুরুটাই হয়েছে গাছ নিয়ে। শেষেও গাছ নিয়ে আলোচনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গাছ অক্সিজেন দেয়, সেটা আমাদের সবারই কম-বেশি জানা। কিন্তু গাছ তো কার্বন-ডাই-অক্সাইডও টেনে নেয়। কিন্তু আপনি জানেন কি, যদি শুধু অক্সিজেন না থাকে তবে এই পৃথিবীতে যত গাছ আছে সব শুকিয়ে যাবে। কেননা গাছকেও বাঁচিয়ে রাখে অক্সিজেন। আর নিমিষের অক্সিজেনহীনতা হতে পারে সেই গাছের জন্য ধ্বংসের কারণ।

সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অক্সিজেন উৎপন্ন করে গাছ ফটোসিন্থেসিস এর মাধ্যমে। তাই গাছকে রক্ষা করা এবং গাছ লাগানো কতটা জরুরি তা তো বুঝতেই পারছেন। অক্সিজেন না থাকলে যত ধাতু আছে সব একসঙ্গে জুড়ে যাবে। কেননা প্রতিটি ধাতুর ওপর অক্সিজেনের স্তর থাকে এবং সেটি না থাকলে পরস্পরের সাথে লেগে থাকা ধাতু নিজে থেকেই জুড়ে যাবে।

পাঁচ সেকেন্ডের জন্য অক্সিজেন না থাকলে আপনার ভাত খাওয়াও বন্ধ হয়ে যেতে পারে! কারণ অক্সিজেন না থাকলে আপনার চুলায় আগুন জ্বলবে না। পৃথিবীর সব জায়গায় যেখানে আগুন জ্বলছে সব নিভে যাবে। অক্সিজেনের অভাবে ভেঙে পড়বে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা। পৃথিবীতে যত গাড়ি আছে সব বন্ধ হয়ে যাবে। একটি গাড়ির ইঞ্জিন কাজ করে ফিউলের সাহায্যে। কিন্তু যদি অক্সিজেন না থাকে তবে কম্প্রেসন হবে না এবং সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ হয়ে যাবে সব গাড়ি।

অক্সিজেন বন্ধ হয়ে গেলে উড়োজাহাজ কিংবা হেলিকপ্টারও চলবে না। আকাশে যে বিমান দেখতে পাই সাঁই সাঁই করে মেঘের ভেতর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিলো, সেটাও ধ্বংস হবে। হাজার হাজার মাইল উপর থেকে ছিটকে পড়বে মাটিতে। যদি অক্সিজেন না থাকে, সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি থেকে আমাদের রক্ষা পাবার কোনো উপায় থাকবে না। রোদে পুড়ে যাবে সবকিছু। মুহূর্তের ভেতর গলে যাবে বড় বড় বরফের চাকা। আর পৃথিবী হয়ে উঠবে বসবাসের অনুপোযোগী।

মস্তিষ্কের সব ধরনের কাজের একমাত্র জ্বালানি অক্সিজেন। বলা হয়, মস্তিষ্কে অক্সিজেনের চালান কমে আসলে হেল্যুসিনেশন দেখা দিতে পারে। এসময় উল্টা-পাল্টা দৃশ্য দেখতে শুরু করে মানুষ। আপনার দেহে মস্তিষ্কই সবচেয়ে বেশি অক্সিজেন গ্রহণ করে। যদিও দেহের ওজনের মাত্র দুই শতাংশ দখল করে মগজ। এই ছোট যন্ত্রই কিন্তু দেহের উৎপাদিত শক্তির ২০ শতাংশ খেয়ে ফেলে। অক্সিজেনের অভাব চলতে থাকলে মাথায় মস্তিষ্কের কোষগুলো মরতে শুরু করে।

আমাদের শরীরের ৭০ শতাংশ পানি। আগেই বলেছি পানি তৈরি হয় অক্সিজেন এবং হাইড্রোজেনের মিশ্রণে। এরপর হঠাৎ অক্সিজেন উধাও হয়ে গেলে আমাদের শরীর শুকিয়ে যাবে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের শরীর হয়ে যাবে মমির মতো। আর এটা শুধু মাত্র মানুষের সাথে ঘটবে এমন নয়, বরং পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে সবার ক্ষেত্রেই এমনটাই ঘটবে।

আপনি হয়তো ভাবছেন পাঁচ সেকেন্ড পর যখন অক্সিজেন ফিরে আসবে তখন হয়তো সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু বিষয়টি মোটেও এমন নয়। পাঁচ সেকেন্ড পর যদি হঠাৎ অক্সিজেন ফিরেও আসে তাহলে পুরো পৃথিবী ঠান্ডা হয়ে যাবে। ঘটবে ভয়ানক বিস্ফোরণ!

শেষ কথা, গাছ লাগান, পৃথিবীটাকে ভরিয়ে ফেলুন অক্সিজেনে। আপনিও সুস্থ থাকবেন।

একটি মন্তব্য করে যান

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন