দেশভাগের নাটকীয়তা: কলকাতা-আসাম কেন বাংলাদেশের হলো না!

কলকাতাও বাংলাদেশের অংশ হতে পারতো!

পূর্ববঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা—এ নিয়ে ছিল বৃহত্তর বঙ্গ (বাংলাদেশ)। তখনকার বঙ্গ যদি ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির সময় পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হতো তবে বাংলাদেশর আয়তন আজ কয়েক গুণ বেড়ে যেতো। দেশভাগের সময় বাঙালি নেতা-কর্মীরা নিশ্চিত ছিলেন যে তাদের পূর্বপুরুষদের বিচরণ করা ভূখণ্ড তাদেরই অংশে পড়বে। কিন্তু ধূর্ত কংগ্রেস, অসভ্য ইংরেজ ও স্বার্থপর পশ্চিম পাকিস্তানীদের কারণে বাংলাদেশ হারায় তার অতীত ভূখণ্ড। ১৯৪৭ সালে যে পাকিস্তান হয় তাতে হিন্দুস্তান ও পাকিস্তানের লাভ হয়, ক্ষতি হয় বাংলাদেশের।

১৯৪০ সালে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক যে লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে ভারতবর্ষে তিনটি দেশের কথা বলেছিলেন সেই তৃতীয় দেশটি বাংলাদেশ। অথচ তার মূল ভূখণ্ড ভারত বিভক্তের সময় ভারতবর্ষের সঙ্গে যুক্ত হয়। বাঙালি জাতি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কলকাতা ও আসাম বাংলাদেশের হওয়ার কথা থাকলেও কিছু স্বার্থপরায়ণ মানুষের কারণে তা সম্ভব হয়নি।

ভারত ভাগের নাটকীয়তা

২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ সাল। জাপানের আত্মসমর্পণের সাথে সাথেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। যুদ্ধোত্তর ব্রিটেনে তখন শ্রমিক দলের সরকার ক্ষমতাসীন ছিল। ক্লিমেন্ট এটলি সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত ব্রিটেন সরকার ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে উদগ্রীব হয়ে পড়ে। সে জন্য তিন সদস্য বিশিষ্ট ‘ব্রিটিশ ক্যাবিনেট’ মিশন ভারতে পাঠানো হয়। সেই তিন সদস্যরা হলেন যথাক্রমে লর্ড পেথ্রিক লরেন্স, স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রীপস ও মিঃ এ. ডি. আলেকজান্ডার।

ক্যাবিনেট মিশনের পক্ষ থেকে ১৯৪৬ সালের ১৬ মে এক ঘোষণায় জানানো হয় যে, পরীক্ষা করে দেখা গেছে মুসলিম লীগের দাবি অনুযায়ী ‘পাকিস্তান’ সৃষ্টি করলেই সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান হবে না। সে কথা মাথায় রেখে ক্যাবিনেট মিশন ভারতের অখণ্ডতা বজায় রেখেই ক্ষমতা হস্তান্তরের এক পরিকল্পনা তৈরি করে। সেটিই ইতিহাসখ্যাত ‘ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান’। তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি মৌলানা আজাদ ছিলেন তার রূপকার।

প্ল্যানের এক নম্বর সুপারিশ ছিল ব্রিটিশ ভারত ও করদ রাজ্যগুলো নিয়ে একটিই ভারত ইউনিয়ন গঠিত হবে। প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ এই তিনটি দপ্তরই শুধু ইউনিয়ন সরকারের হাতে থাকবে। উক্ত তিনটি দপ্তরের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের ক্ষমতা ইউনিয়ন সরকারের হাতে থাকবে। এই তিনটি বিষয় ছাড়া বাকি সকল বিষয়ের ক্ষমতা থাকবে প্রদেশ সরকারের উপর।

ক্লিমেন্ট এটলি

‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’—এই তিনটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে প্রদেশগুলো নিজ নিজ সংবিধান তৈরি করবে। গ্রুপ এ-তে মাদ্রাজ, বোম্বে, মধ্য প্রদেশ, যুক্ত প্রদেশ, বিহার এবং উড়িষ্যা। গ্রুপ বি-তে পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু এবং বেলুচিস্তান। গ্রুপ সি-তে বাংলা এবং আসাম।

গ্রুপ এ ছিল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল। গ্রুপ বি এবং সি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল। অঞ্চল তথা প্রদেশের থাকবে সর্বাধিক স্বায়ত্তশাসন। কেন্দ্রের হাতে থাকবে শুধু প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি এবং যোগাযোগ। সমগ্র ভারতবর্ষের জন্য প্রাদেশিক পরিষদসমূহ থেকে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের (Proportional representation) ভিত্তিতে ৩৮৯ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হবে গণপরিষদ বা (Constituent Assembly)। যাদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব থাকবে তারা হলেন হিন্দু, মুসলমান এবং শিখ। এই হলো ক্যাবিনেট মিশন ফর্মুলার সংক্ষিপ্ত সার। ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যানে ইউনিয়ন স্তরে পাকিস্তান দাবি অগ্রাহ্য হলেও প্রদেশ স্তরে মুসলিম লীগের দাবি অনেকটাই মানা হয়ে যায়। যে কয়টি প্রদেশ নিয়ে মুসলিম লীগ পাকিস্তান দাবি করেছিল ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যানে আসামসহ তার সবকয়টি দুটি গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হয় ( বি ও সি গ্রুপ)। ওইসব প্রদেশের স্বতন্ত্র সংবিধান শাসন ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার বিষয়টা সুস্পষ্ট হওয়ায় মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তার পাকিস্তান প্রস্তাব থেকে সরে আসেন এবং ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব গ্রহণ করেন। কিন্তু কংগ্রেস নেতা জওহর লাল নেহেরু এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। নেহরুর ভয় ছিল, যেহেতু গ্রুপ বি এবং সি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল, তাই অবিভক্ত বাংলা, আসাম এবং অবিভক্ত পাঞ্জাবে ডোমিনেট করবে মুসলমানরা। নেহরু এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করার পর মুসলিম লীগ আবার পাকিস্তানের দাবিতে ফিরে যায় এবং ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ বা ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ ঘোষণা করে। এই টানাপোড়নের ফলে শেষ পর্যন্ত ‘ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান’ পরিত্যক্ত হয়।

পরবর্তী ভাইসরয় ও গভর্নর নিযুক্ত হন লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন। ভারতে আসার আগেই মাউন্টব্যাটেন ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার জন্য লন্ডনে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আর্জি জানান। ক্লিমেন্ট এটলি সেইমত পার্লামেন্টে তার ইঙ্গিতও দেন। সেই ইঙ্গিতে স্পষ্ট হয় ১৯৪৮ সালের জুনে ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে। মাউন্টব্যাটেন ভারতে আসেন ১৯৪৭ সালের মার্চ মাসে। ভারত ভাগ এড়াতে মাউন্টব্যাটেন এক অদ্ভুত প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। সেটি ছিলো ‘প্ল্যান বলকান’, আর তার সারমর্ম ছিল ইউরোপের বলকান দেশগুলোর মতো ক্ষমতা হস্তান্তর করা। মাউন্টব্যাটেনের পূর্বসূরি লর্ড ওয়াভেলও ‘অপারেশন ব্রেকডাউন’ নামে একটি পরিকল্পনা করেছিলেন। তাতে ভারতকে কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করে সেসব অঞ্চলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বলা হয়েছিল। মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস উভয় দল দ্বারাই ওই অবাস্তব পরিকল্পনা দুটি বাতিল করা হয়। প্রকৃতপক্ষে ওই দুটি পরিকল্পনাই ছিল ভারতকে বহুখণ্ডে বিভক্ত করার এক সুচিন্তিত কূট পরিকল্পনা।

মাউন্টব্যাটেন জানতেন কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মাঝে ভারত ভাগ নিয়ে এক টানাপোড়েন চলছে; তাই তিনি বুদ্ধি করে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া প্রায় দশ মাস এগিয়ে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট করার কৌশল অবলম্বন করেন। আর সেটিকে বিশ্বাসযোগ্যতা দিতেই মাউন্টব্যাটেন কংগ্রেস নেতৃত্বের সামনে এক ‘টোপ’ রাখেন। সেটি ছিল কংগ্রেস যদি কমনওয়েলথ এ থাকতে প্রথমাবধিই রাজি থাকে তাহলে ক্ষমতা হস্তান্তর দশ মাস আগেই হবে। চরম ধৈর্যচ্যুত কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ এতে রাজি হয়ে যান। এদিকে মুসলিম লীগের কমনওয়েলথ এ প্রথমাবধিই থাকতে কোন আপত্তি ছিল না। তাছাড়া পাকিস্তান প্রায় হাতের মুঠোয় চলে আসায় তারাও দেশ ভাগ তাড়াতাড়ি করতে রাজি হয়ে যায়।

মাউন্টব্যাটেনের কৌশল মাফিকই ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে দেশভাগ ও ক্ষমতা উভয়ই হস্তান্তরের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান দুটি স্বাধীন ডোমিনিয়নের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে হাজার হাজার হিন্দু, মুসলমান এবং শিখের রক্তের বিনিময়ে অবিভক্ত পাঞ্জাব এবং অবিভক্ত বাংলা বিভক্ত হয়ে পশ্চিম পাঞ্জাব ও পূর্ব পাঞ্জাব এবং পশ্চিম বঙ্গ ও পূর্ব বঙ্গ নাম ধারণ করে যথাক্রমে ভারত ও পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হয়।

বঙ্গভঙ্গ ম্যাপ ১৯০৫ সাল

কলকাতা ও আসাম ভারত পাবে নাকি পাকিস্তান?

কলকাতা ও আসাম ভারতে যাবে নাকি পাকিস্তান এ নিয়ে শুরু হয় এক কঠিন ষড়যন্ত্র। কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা নেতারা বাংলাদেশ ভাগ করতে হবে বলে জনমত সৃষ্টি করতে শুরু করলো। বাংলাদেশ যে ভাগ হবে, বাংলাদেশের নেতারা তা জানতেন না। এই অঞ্চলের নেতাদের ধারণা ছিল সমগ্র বাংলা ও আসাম পাকিস্তানে আসবে। কিন্তু পরবর্তীতে তারা জানতে পারলেন, আসামের একটি জেলা, যেটি বর্তমানে সিলেট, পাকিস্তানের আওতায় আসবে যদি তারা সেটা গণভোটে জিততে পারে।

তবে গোপনে গোপনে কলকাতার মুসলমানরা প্রস্তুত ছিল, যা হয় হবে, কলকাতা ছাড়া যাবে না। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পক্ষ থেকে বাংলা সরকারের অর্থমন্ত্রী জনাব মোহাম্মদ আলী ঘোষণা করেছিলেন, কলকাতা আমাদের রাজধানী থাকবে। এ সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম মুসলিম লীগের তরফ থেকে এবং শরৎ বসু ও কিরণ শংকর রায় কংগ্রেসের তরফ থেকে এক আলোচনা সভা করেন। তাদের আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয় যে, বাংলাদেশ ভাগ না করে অন্য কোন পন্থা অবলম্বন করা যায় কি-না? বাংলাদেশের কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতারা এ নিয়ে একটা ফর্মুলা ঠিক করেন। ঐ ফর্মুলায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ হবে স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্র। জনসাধারণের ভোটে একটা গণপরিষদ হবে। এ ফর্মুলা নিয়ে শরৎ বসু গান্ধীর সাথে এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে দেখা করতে যান।

জানা যায়, এ ফর্মুলা নিয়ে জিন্নাহর কোন আপত্তি ছিল না, যদি কংগ্রেস রাজি হয়। কিন্তু ওই ফর্মুলা নিয়ে শরৎ বসু কংগ্রেস নেতাদের সাথে দেখা করতে গিয়ে অপমানিত হয়ে ফেরত এসেছিলেন বলে জানা যায়। কংগ্রেসের সিনিয়র নেতারা কলকাতা তাদের হবে বলে উল্টা দাবি করে বসেন। অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকার বলে দিয়েছিল, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ একমত না হলে তারা নতুন কোন ফর্মুলা মানতে পারবে না।

কলকাতা ভাগ নিয়ে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের বই ‘মিশন উইথ মাউন্টব্যাটেন’ উদ্ধৃত করে শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছিলেন, ‘‘ইংরেজরা তখনো ঠিক করে নাই কলকাতা পাকিস্তানে আসবে, না হিন্দুস্তানে থাকবে। আর যদি কোন উপায় না থাকে তবে একে ‘ফ্রি শহর’ করা যায় কি-না? কারণ, কলকাতার হিন্দু মুসলমান লড়বার জন্য প্রস্তুত। যে কোন সময় দাঙ্গাহাঙ্গামা ভীষণ রূপ নিতে পারে। কলকাতা হিন্দুস্তানে পড়লেও শিয়ালদহ স্টেশন পর্যন্ত পাকিস্তানে আসার সম্ভাবনা ছিল। হিন্দুরা কলকাতা পাবার জন্য আরও অনেক কিছু ছেড়ে দিতে বাধ্য হতো।’’

সেসময় বাঙালি মুসলমানদের দাবি ছিল, কলকাতাকে যে করেই হোক বাংলাদেশের সঙ্গে রাখা। কারণ এই কলকাতার সমৃদ্ধি এসেছে পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের মানুষের শ্রমের , সম্পদের কারণে। পূর্ব বাংলার অর্থনীতি দিয়ে কলকাতাকে ঐশ্বর্যমন্ডিত করে সাজানো হয়। অথচ সেই কলকাতাই বাংলাদেশের মধ্যে নেই। এতে রয়েছে গভীর ষড়যন্ত্র। মাউন্টব্যাটেন, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের স্বার্থপর কার্যকালাপের ফলে বাংলাদেশের হারাতে হয়েছে বিশাল ভূখন্ড। ওই সময় বড়লাট লর্ড মাউন্টব্যাটেন তলে তলে কংগ্রেসকে সাহায্য করেছিলেন। তার ইচ্ছে ছিল, তিনি ভারত ও পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল একসাথেই থাকবেন। জিন্নাহ রাজি হলেন না, নিজেই পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হয়ে বসলেন। মাউন্টব্যাটেন সম্বন্ধে বোধহয় তার ধারণা ভাল ছিল না। মাউন্টব্যাটেন ক্ষেপে গিয়ে পাকিস্তানের সর্বনাশ করার চেষ্টা করলেন। তিনি নিজেই গোপনে কংগ্রেসের সাথে পরামর্শ করে একটা ম্যাপ রেখা তৈরি করেছিলেন বলে অনেকের ধারণা।

লর্ড মাউন্টব্যাটেনের বই ‘মিশন উইথ মাউন্টব্যাটেন’

ভারতীয় কংগ্রেস সেসময় ইংরেজদের সাথে হাত মিলিয়ে ভারত বিভাগ চেয়েছিল। অনেকেই আমাদের মধ্যে কংগ্রেসকে ভারত ভাগের দায় থেকে মুক্ত করতে চান র‌্যাডক্লিফের উপর দায় চাপিয়ে। মূলত, র‌্যাডক্লিলের সাথে কংগ্রেসের গোপন যোগাযোগ ছিল বলে অনেকে তখন ধারণা করতেন। এটা সত্য হতে পারে। কারণ র‌্যাডক্লিফের কারসাজিতে পূর্ববাংলা তার বিপুল পরিমাণ জায়গা হারায়। একই সাথে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার পরেও অনেক অঞ্চল পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে পড়েনি।

অপর দিকে জিন্নাহর বাঙালির প্রতি কেবল ১৯৪৭ সালের ভাষা নিয়েই বিরূপ ছিল না, তার আগে থেকেই বাংলাদেশি বাঙালির অধিকারের প্রতি সে ছিল উদাসীন। তার ছিল গভর্নর হওয়ার খায়েশ। সে বুঝতে পেরেছিল কংগ্রেসের ক্ষমতালোভী নেহরু ও সরদার প্যাটেলের সাথে সে ভারতের ক্ষমতা কুক্ষীগত করতে পারবেনা, কিন্তু নয়া রাষ্ট্র পাকিস্তানের ক্ষমতা সে অচিরেই দখল করতে পারবে। তার উদ্দেশ্য ছিল গভর্নর হওয়া, পাকিস্তানের মুসলমানদের অধিকার দেখা নয়।

শেষ পর্যন্ত এই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ যে বিশাল ভূখণ্ড হারালো তা এই ক্ষমতালোভীরা কেউই গুরুত্ব দিলোনা। ফলশ্রুতিতে আসাম ও কলকাতা বাংলাদেশের হওয়া সত্বেও পেয়ে গেল ভারত।

বঙ্গবন্ধুর লেখনিতে বাংলাভাগ

বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান এ সম্পর্কে বিস্তারিত বলেছেন। তিনি তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের ৭৩-৭৪ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘১৯৪৭ সালের জুন মাসে ঘোষণা করা হলো ভারতবর্ষ ভাগ হবে। কংগ্রেস ভারতবর্ষকে ভাগ করতে রাজি হয়েছে এজন্য যে, বাংলাদেশ ও পাঞ্জাব ভাগ হবে। আসামের সিলেট জেলা ছাড়া আর কিছুই পাকিস্তানে আসবে না। বাংলাদেশের কলকাতা এবং তার আশপাশের জেলাগুলোও ভারতবর্ষে থাকবে। মওলানা আকরম খাঁ সাহেব ও মুসলিম লীগ নেতারা বাংলাদেশ ভাগ করার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করলেন। বর্ধমান ডিভিশন আমরা নাও পেতে পারি। কলকাতা কেন পাব না? কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা বাংলাদেশ ভাগ করতে হবে বলে জনমত সৃষ্টি করতে শুরু করল। বাংলাদেশ যে ভাগ হবে, বাংলাদেশের নেতারা তা জানতেন না। সমস্ত বাংলা ও আসাম পাকিস্তানে আসবে এটাই ছিল তাদের ধারণা।’

তিনি আরও বলেছেন, ‘এই সময় শহীদ (সোহরাওয়ার্দী) সাহেব ও (আবুল) হাশিম সাহেব মুসলিম লীগের তরফ থেকে এবং শরৎ বসু ও কিরণশংকর রায় কংগ্রেসের তরফ থেকে এক আলোচনা সভা করেন। তাদের আলোচনায় এই সিদ্ধান্ত হয় যে, বাংলাদেশ ভাগ না করে অন্য কোনো পন্থা অবলম্বন করা যায় কি-না? শহীদ সাহেব দিল্লিতে জিন্নাহর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তার অনুমতি নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। বাংলাদেশের কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতারা একটা ফর্মুলা ঠিক করেন। বেঙ্গল মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটি একটি ফর্মুলা সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করে। আমার যতদূর মনে আছে, তাতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে। জনসাধারণের ভোটে একটা গণপরিষদ হবে। সেই গণপরিষদ ঠিক করবে বাংলাদেশ হিন্দুস্তান না পাকিস্তানে যোগদান করবে, নাকি স্বাধীন থাকবে। যদি দেখা যায়, গণপরিষদের বেশি সংখ্যক প্রতিনিধি পাকিস্তানে যোগদানের পক্ষপাতী, তবে বাংলাদেশ পুরোপুরিভাবে পাকিস্তানে যোগদান করবে। আর যদি দেখা যায় বেশি সংখ্যক লোক ভারতবর্ষে থাকতে চায়, তবে বাংলাদেশ ভারতবর্ষে যোগ দেবে। যদি স্বাধীন থাকতে চায়, তাও থাকতে পারবে। এই ফর্মুলা নিয়ে সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বসু দিল্লিতে জিন্নাহ ও গান্ধীর সাথে দেখা করতে যান। শরৎ বসু নিজে লিখে গেছেন যে জিন্নাহ তাকে বলেছিলেন, মুসলিম লীগের কোনো আপত্তি নেই, যদি কংগ্রেস রাজি হয়। ব্রিটিশ সরকার বলে দিয়েছে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ একমত না হলে তারা নতুন কোনো ফর্মুলা মানতে পারবেন না।’

সিলেটের চা বাগানে মুসলিম লীগ কর্মী ও অন্যান্যদের সাথে জিন্নাহ

শেখ মুজিবুর রহমান আরও জানান, ‘শরৎ বাবু কংগ্রেসের নেতাদের সাথে দেখা করতে গিয়ে অপমানিত হয়ে ফিরে এসেছিলেন। কারণ সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল তাকে বলেছিলেন, ‘শরৎ বাবু, পাগলামি ছাড়েন, কলকাতা আমাদের চাই।’ মহাত্মা গান্ধী ও নেহেরু কোন কিছুই না বলে শরৎ বাবুকে সরদার প্যাটেলের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আর মিস্টার প্যাটেল শরৎ বাবুকে খুব কঠিন কথা বলে বিদায় দিয়েছিলেন। কলকাতা ফিরে এসে শরৎ বসু খবরের কাগজে বিবৃতির মাধ্যমে একথা বলেছিলেন এবং জিন্নাহ যে রাজি হয়েছিলেন সে কথা স্বীকার করেছিলেন।’

শেখ মুজিবুর রহমান আরও লিখেছেন, ‘জিন্নাহর জীবদ্দশায় তিনি কোনোদিন শহীদ সাহেবকে দোষারোপ করেননি। কারণ তার বিনা সম্মতিতে কোনো কিছুই তখন করা হয়নি।’ খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেব ১৯৪৭ সালের ২২ এপ্রিল ঘোষণা করেছিলেন, ‘যুক্ত বাংলা হলে হিন্দু-মুসলমানের মঙ্গলই হবে।’ মাওলানা আকরম খাঁ সাহেব মুসলিম লীগের সভাপতি হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন, “আমার রক্তের উপর দিয়ে বাংলাদেশ ভাগ হবে। আমার জীবন থাকতে বাংলাদেশ ভাগ করতে দেব না। সমস্ত বাংলাদেশই পাকিস্তানে যাবে।’ এই ভাষা না হলেও কথাগুলোর অর্থ এই ছিল। ‘আজাদ’ কাগজ আজও আছে। ১৯৪৭ সালের কাগজ বের করলেই দেখা যাবে।”

আসামের সিলেট ও করিমগঞ্জ বিতর্ক

১৯৪৭ সালের ৩ জুন ভারতবর্ষের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও শিখ নেতাদের সাথে আলাপ শেষে ধর্মীয় বিভাজনের ভিত্তিতে ভারতভাগ ও স্বাধীনতা প্রদানের রূপরেখা প্রণয়ন করেন। ফলশ্রুতিতে পাঞ্জাবের মতো বাংলাকেও ভারত ও পাকিস্তানের মাঝে ভাগ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

রুপরেখা অনুযায়ী, পাঞ্জাব ও বাংলার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যাবে পাকিস্তানে, বাকিটা ভারতে। অন্যদিকে আসামের পুরোটা যাবে ভারতে, কেবলমাত্র আসামের একটি জেলা সিলেটের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে তার জনগণ। আসামের গভর্নর জেনারেলের তত্ত্বাবধানে ১৯৪৭ সালের ৩ জুলাই সিলেটে গণভোট আয়োজনের চূড়ান্ত ঘোষণা দিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। তাতে বলা হলো যে, ভোটের ফলাফলের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে সিলেট আসামের সাথে থেকে গিয়ে ভারতের অংশ হবে, নাকি পূর্ববঙ্গের অংশ হয়ে পাকিস্তানভুক্ত হবে। সেই সাথে সিলেট যদি পাকিস্তানের অংশ হতে চায়, তবে কাছাড় জেলার হাইলাকান্দি মহকুমাসহ সিলেট-সন্নিহিত মুসলিম অঞ্চলগুলোও পূর্ববঙ্গের অধিভুক্ত হবে। ভোটে সিলেট পাকিস্তানে থাকার সিদ্ধান্ত হয়।

কিন্তু বিতর্ক শুরু হয় করিমগঞ্জ নিয়ে। সিরিল জন র‍্যাডক্লিফকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ধর্মীয় সংখ্যানুপাতের ভিত্তিতে ও কংগ্রেস-মুসলিম লীগের দাবিসমূহের সামঞ্জস্যতা বিধান করে ভারত-পাকিস্তানের সীমানা নিরূপণের। ১২ আগস্ট সেই ‘র‍্যাডক্লিফ লাইন’ প্রকাশিত হয়। র‍্যাডক্লিফ লাইনে আবার করিমগঞ্জকে ফেলা হয় ভারতের পরিসীমায়।

উল্লেখ্য, সিলেটের দক্ষিণ বা মৌলভীবাজার মহকুমায় নিরঙ্কুশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকা সত্ত্বেও সিলেটের অংশ হিসেবে তা পূর্ববঙ্গের অঙ্গীভূত হয়। কিন্তু করিমগঞ্জ মহকুমায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেমন ছিল, তেমনি ভোটগ্রহণেও পূর্ববঙ্গে যোগদানের পক্ষে জনরায় ছিল। তা সত্ত্বেও গণভোটের ফলাফল ও গণভোটের পূর্বপ্রতিশ্রুত ঘোষণাপত্রকে অবজ্ঞা করে করিমগঞ্জ মহকুমার চার থানা- করিমগঞ্জ, বদরপুর, পাথারকান্দি, রাতাবাড়ির মধ্যে তিনটির পুরোপুরি ও একটির অর্ধেক ভারতকে দিয়ে দেয় সীমানা কমিশন।

অর্থাৎ ভোটের রায়ে যেখানে গোটা সিলেট জিতে হাইলাকান্দিসহ সন্নিহিত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা পাওয়ার কথা পূর্ববঙ্গ বা তৎকালীন পাকিস্তানের, সেখানে উল্টো ভারতের কাছেই করিমগঞ্জের প্রায় পুরোটা খোয়াতে হয়।

শেষ কথা, ১৯৪৭ সালে বাংলাদেশ নিজেদের অঞ্চল হওয়া সত্বেও কিছু স্বার্থপর ও ক্ষমতালোভী মানুষের জন্য আমরা হারিয়েছে কিছু ভূখণ্ড। দেশভাগের নামে বাংলাদেশকে ভাগ করে নিয়েছিলো তারা। বঙ্গবন্ধুর মতে, তখনকার ভারত ভাগ ছিল মূলত ‘বাংলাদেশ ভাগ’।

একটি মন্তব্য করে যান

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন