তাল বাংলাদেশের, পড়ে ভারতে

তালগাছ বাংলাদেশে, কুড়াতে হয় ভারত থেকে

আধাপাকা বাড়িঘর। বাড়ির ঘুমানোর জন্য তৈরি ঘরটি বেশ বড়সড়। তার পাশে রান্নাঘরটি একটু ছোট। দু-ঘরের মাঝে তাল গাছও আছে। আর তাল গাছের গোড়াতে আছে একটি আন্তর্জাতিক পিলার। বাংলাদেশ ভারতের এ সীমান্ত পিলারটি দু-ভাগ করে দিয়েছে বাড়িটিকে। ঘুমানোর ঘরটি বাংলাদেশে আর খাবার ঘরটি ভারতে। বাড়ির উঠোনে থাকা তাল গাছটি একটু বাঁকা। এর গোড়াটি বাংলাদেশে পড়লেও কাণ্ডটি রয়েছে ভারতের সীমানায়। বাংলাদেশের গাছের তাল গিয়ে কুড়াতে হয় ভারত থেকে।

এ ধরনের অসংখ্য অবৈজ্ঞানিক সীমান্ত রেখে জটিল করে রেখেছে সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষগুলোকে। মুখ দেখলেই বোঝা যায় জটিলতা খুব একটা টানে না তাদের। মাছ ধরে, শস্য আবাদ করেই মূলত জীবন চলে বাংলাদেশের সাতক্ষীরার সীমান্ত এলাকার মানুষের। একই চিত্র ভারত অংশে পড়া পশ্চিমবঙ্গের হাসনাবাদ এলাকার মানুষের।

একই গ্রামে দু-দেশের মানুষ বছরের পর বছর বাস করছেন অনেকটা নির্বিবাদেই। মাঝে মধ্যে দু-দেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি হলেও তা সাধারণের মধ্যে তেমন প্রভাব ফেলে না। এমনই বলছিলেন ৭৯ বছর বয়সী জাম্মাদ আলী গাজী। নিজের বয়স যখন দশ তখন প্রথম বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পিলার দেখেছেন তিনি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বাংলাদেশি এই নাগরিক থাকেন সাতক্ষীরার হড়দহ এলাকায়। যার ওপারেই ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনার পানিতর এলাকা। কলকাতা থেকে এই এলাকার দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার।

পড়তে ক্লিক করুন: কলকাতা-আসাম যে কারণে বাংলাদেশের হলো না

এই সীমান্তের অনেক ঘরই দু-দেশের সীমানার মধ্যে পড়েছে। জাম্মাদ গাজীর বাড়িটি বাংলাদেশে হলেও চিকিৎসার জন্য তাকে যেতে হয় ভারতে। কারণ বাংলাদেশের সীমানার ভেতর হাসপাতালটি একটু দূরে। আর রোগবালাই হলে ভারতের সীমান্তরক্ষীরাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন বাংলাদেশিদের জন্য। একইভাবে যেকোনো সংসদে ভারতীয় নাগরিকরাও বাংলাদেশের নিরাপত্তারক্ষীদের সহায়তা পান। মাঝে মাঝে কিছুটা সঙ্কট তৈরি করে চোরাচালানি চক্র। তবে দু-দেশের সাধারণ নাগরিকদের খুব একটা সমস্যা নেই।

আরো অনেকের মতো ‘বর্ডার লাইন’, ‘সীমান্ত পিলার’ এসবের ব্যবধান তার কাছে খুব একটা নেই। তবুও দুই দেশ হওয়ার কারণে নিজের ইচ্ছেমতো যেতে পারেন না স্বজনদের দেখতে।

অনেক সময় সীমান্তে দুর্ভাগ্যবশত কিছু ঘটনা ঘটে

সীমান্তে দাঁড়িয়েই কথা হয় তার সঙ্গে

‘আমার পাঁচ চেলে পাঁচজনই ইন্ডিয়ায় থাকে। কাজের সুবিধার জন্য তারা ওকিনি থাকে। ৪০ বছর তাদের সঙ্গে দিখা হয় না। আমার বউ চলি গেছে ২৪ বছর।’ সাতক্ষীরার আঞ্চলিক ভাষায় কথাগুলো বলছিলেন জাম্মাদ গাজী।

পাসপোর্ট নিয়ে ভিসা লাগিয়ে ভারত যাওয়ার চেষ্টা করেন না কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি একা থাকি। কে করি দ্যাবে। যদি পারমিট (স্বল্পকালীন ভিসা) থাইকতো তবে ঘুরি আসতাম।’

ভারতের পানিতরের এই সীমান্তে বাংলাদেশ অংশে কথা হয় নাসিমা মণ্ডলের সঙ্গে। শ্বশুরবাড়ি সাতক্ষীরা সদর থেকে হড়দহে বাবার বাড়িতে এসেছেন নাসিমা। বাড়ির ঘরগুলো বাংলাদেশে পড়লেও উঠোনের একটা অংশ ভারতে। নাসিমা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই এমন দেখি আসতিছি। আমরা বাংলাদেশের লোক। ওপারে (ভারতে) আত্মীয় আছে। বেশিদূর যেতি পারিনে। তবে দুই দেশ মনে হয় না। সবাই তো অনেকদিনির পরিচিত।’

পড়তে ক্লিক করুন: ‘ভারতীয় দালাল’ হটাও আন্দোলন, বাংলাদেশজুড়ে পোস্টার

সীমান্ত এলাকার এই অঞ্চলের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দু-দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি ও বিএসএফ স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ আচরণ করে। বর্ডার লাইনের গা ঘেঁষে বাড়ি কিংবা দু-পাড়ে বাড়ির সীমান্ত পড়লেও এই এলাকার লোকজনের কাছে দু-দেশের অস্তিত্ব অনেকটা ওই সীমানা পিলার আর চেকপোস্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

ভারতের নাগরিক আমারুল্লাহ গাজী বলেন, ‘আমার প্রায় সব বন্ধু ওই পলোকার। মাঠে কাজ করতি করতি কথা হয়। আড্ডা মারি। বর্ডারের লাইন দেখি মনে হয় দুটো দেশ। কিন্তু সব তো একই।’

একই কথা বলছিলেন রজব আলী মোল্লা। ভারতের এই নাগরিক বলেন, ‘এক সময় বিয়ে হতো দু-পাড়ের মানুষের মধ্যে। এখন আর হয় না। তবে আগের চেয়ে সীমান্ত অনেক শক্ত হয়েছে। খন দু-তিনদিনের জন্য এদেশ-ওদেশ যাওয়া যায় না। বড়জোর এক দেশের মানুষ অন্য দেশে গিয়ে দাওয়তা খেয়ে আসতে পারেন। স্থানী বিএসএফ বা বিজিবি জওয়ানদের বলেই তারা এসব যোগাযোগ করেন।

স্থানীয় বাংলাদেশি নাগরিক আবদুর রহিম বলেন, ‘পাশের গ্রামের এলাকায় ঘুরলে তো আর সমস্যা নেই। বেশিদূর যাইনে। এলাকার লোকজন চলিগিলি পারমিট থাকলি ভালো হতো।’

একই এলাকার জাকির আলী গাজীর গোয়াল ঘরের একটা অংশ পড়েছে বাংলাদেশে আর থাকার ঘর ভারতে। তিনি বলেন, ‘ছোটবিলাততে এ রকম দেখি। আলাদা দেশ মনে হয় পোস্ট-পিলার দেখলি। ছোটবিলায় খুব যাতাম। একন কম যাই।’ দু-দেশে বাড়ির অংশ পড়ায় সমস্যা হয় কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নাহ, সমস্যা কিসের। একটুখানি জানিতো। তবে ইকেনের তে (এখান থেকে) পারমিট থাকলি ভালো হইতো।’

জয়নাল গাজী পেশায় কৃষক। বাড়ি বাংলাদেশে হলেও বর্গা কাজ করেন ভারতীয় মালিকের জমিতে। তিনি এ এলাকা পরিদর্শনরত সাংবাদিককে বলেন, ‘কাজ করতি অসুবিধা হয় না, তবে পারমিট থাকলি ভালো হতো। দু-চারদিন কাজ করি চলি আসতাম।’

পানিতর বিএসএফ বর্ডার আউট পোস্টের (বিওপি) কোম্পানি কমান্ডার অশোক হালদার বলেন, ‘এই এলাকার বর্ডার লাইন যেহেতু জিগজ্যাগ (আঁকাবাঁকা) সেজন্য বিজিবি-বিএসএফ দুই বাহিনীই এখানে মানবিকতাকে প্রাধান্য দেয়। এখানে দুই ফুটের মধ্যে দুটো দেশ। নিরাপত্তার ব্যাপারে আমরা দুই বাহিনী কোনো ছাড় দিই না। কিন্তু মানুষের প্রয়োজনে যৌথভাবে আমরা সমস্যার সমাধান করি।’

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর ১৪৪ ব্যাটেলিয়ন মোতায়েন রয়েছে এই এলাকায়। স্বল্প সময়ের এই ভিসার বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যাটেলিয়ন কমান্ডার বিক্রম শর্মা বলেন, ‘দু-দেশের সরকারি পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হলে এটার ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। বিজিবির সঙ্গে বিএসএফ-এর বর্তমান সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হলে আমরা দুই বাহিনী মিলে এটা তদারকি করতে পারবো। আর এটা যদি হয় তাহলে এই সীমান্ত এলাকার উভয় পাশের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরাধীরা বাধ্য করে গুলি করতে। এত কাছ থেকে আক্রমণ করে যে গুলি করা ছাড়া উপায় থাকে না। আত্মরক্ষার্থে গুলি করতেই হয়। তবে আমরা উভয় বাহিনীই চেষ্টা করছি আমাদের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিতে, যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে।

আমরা বিশ্বাস করি এটা শূন্যের কোঠায় আনা যাবে। ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে আমাদের একভাবে কাজ করতে হয়, কারণ ওপার একটি শত্রু দেশ। আর ইস্টার্ন ফ্রন্টে অন্যভাবে কাজ করতে হয়। যেসব ব্যাটেলিয়ন কাজ করছে তাদেরকে বলা হয় যে, এখানে একই কৌশলে কাজ করা যাবে না। কারণ বাংলাদেশ আমাদের অত্যন্ত বন্ধু রাষ্ট্র। এখানে একটু সময় লাগবে। ননলিথাল অস্ত্র ব্যবহার করে এটা এড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

আমাদের সৈন্যরা খুব কাছ থেকে আক্রমণের শিকার না হলে ফায়ার করে না। আমাদের মন্ত্রণালয় ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের স্পষ্ট নির্দেশনা আছে এবং আমিও দিয়ে থাকি যেকোনো ধরনের হতাহতের ঘটনা যেন না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কিছু ঘটনা ঘটে। আমরা এটা কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি। আমি নিশ্চিত যে, একটা সময় এটা কমে আসবে। একটা সময় এটা শূন্যের কোটায় চলে আসবে। কিন্তু যদি আমার কাছে জানতে চান কবে, সেটা সময় বেঁধে বলা যাবে না। তবে এটা শূন্যের কোটায় চলে আসবে, এটা সম্ভব। অপরাধীরা দা, ধারালো অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করে, তখন বাধ্য হয়ে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালাতে হয়। আমরা সবসময় বলি গুলি চালিয়ো না। গুলি চালানো লাস্ট স্টেজ।’

ফায়ার বেড়ে গেছে, তাহলে কী অপরাধ বেড়ে গেছে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা সতর্ক করার জন্য গুলি চালাই।’

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখক এই এলাকা পরিদর্শন করেছেন ২০১৬ সালে। সাম্প্রতিক সময়ের কিছু তথ্য যোগ করে তখনকার অভিজ্ঞতাই প্রকাশ করা হলো।

একটি মন্তব্য করে যান

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন