করোনার কোন ভ্যাকসিন কী পর্যায়ে আছে?

ভ্যাকসিন নিয়ে নানান দেশের অসংখ্য কোম্পানীর দৌড়ঝাঁপ চলছে

করোনাভাইরাস মহামারির ছয় মাস পার করল বিশ্ব। অনেক আগে থেকেই ভ্যাকসিন নিয়ে নানান দেশের অসংখ্য কোম্পানী দৌড়ঝাঁপ শুরু করলেও, কেউই এখনও বাজারে আনতে পারেনি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) জানাচ্ছে, এখনও ১৩৫ রকমের কোভিড ভ্যাকসিন তৈরি হওয়ার পথে। তার মধ্যে কিছু ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হয়েছে মানুষের শরীরে, কিছুর ট্রায়াল হয়েছে পশুদের শরীরে। প্রিক্লিনিকাল স্টেজে রয়েছে প্রায় ১২৫ রকমের ভ্যাকসিন।

এখন দেখে নেওয়া যাক কোন ভ্যাকসিন কী পর্যায়ে আছে—

অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন

ভাইরাল ভেক্টর ভ্যাকসিন বানাচ্ছে ব্রিটেনের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি। এই গবেষণায় তাদের সঙ্গে রয়েছে অ্যাস্ট্রজেনেকা। ভ্যাকসিনটির তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা চলছে। এতে আরও ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবীকে যুক্ত করার কাজ চলছে। ব্রাজিলে স্বেচ্ছাসেবকেরা যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কোভিড-১৯ প্রতিরোধী পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে শুরু করেছেন। এতে দেশটির পাঁচ হাজার স্বেচ্ছাসেবী অংশ নিচ্ছেন। অক্সফোর্ড জেনার ইনস্টিটিউটের তৈরি ভ্যাকসিনটি বর্তমানে যুক্তরাজ্যেও পরীক্ষা চলছে। সেখানে চার হাজার স্বেচ্ছাসেবী ইতিমধ্যে ভ্যাকসিনটি নিয়েছেন এবং আরও ১০ হাজার জনকে পরীক্ষায় যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এটির নাম দেয়া হয়েছে AZD1222।

মডার্না বায়োটেক

প্রথমবার মানুষের শরীরে ভ্যাকসিন ট্রায়াল করেছিল আমেরিকার মডার্না। প্রথম পর্যায়ে দুই সন্তানের মা ৪৩ বছরের জেনিফার হ্যালারকে দেওয়া হয়েছিল ভ্যাকসিন। দ্বিতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালও শেষ। জুলাই মাসে ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে দেওয়ার মধ্য দিয়ে তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা শুরু হবে। মডার্নার এমআরএনএ-১২৩৩ ভ্যাকসিন তৈরিতে অক্সফোর্ডের পর দৌড়ে এগিয়ে এই ভ্যাকসিন।

বায়োএনটেক ও ফাইজার

জার্মান বায়োটেকনোলজি ফার্ম বায়োএনটেক এসই-র সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কোভিড ভ্যাকসিন বানাচ্ছে ফাইজার। আমেরিকাতেই ৩৬০ জনের উপরে ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হয়েছে। এখনও পর্যন্ত ক্লিনিকাল ট্রায়ালের ফল সন্তোষজনক বলেই দাবি করেছেন ফাইজারের কর্ণধার অ্যালবার্ট বোরলা। আরএনএ টেকনোলজিকে কাজে লাগিয়ে তৈরি এই ভ্যাকসিন ক্যানডিডেটের নাম BNT162।

সানোফির ভ্যাকসিন

অক্সফোর্ড বা মডার্নার চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও ফরাসি ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা সানোফির তৈরি এই ভ্যাকসিনের অগ্রগতিও আশানুরূপ। একাধিক টিকা প্রস্তুত করেছে তারা। পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হবে এ বছরের অক্টোবর থেকে। সানোফি আগেই জানিয়েছিল, মার্কিন স্টার্টআপ সংস্থা ‘ট্র্যানস্লেট বায়ো’র সঙ্গে যৌথভাবে টিকা তৈরিতে তারা ৪২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে। সংস্থার সিইও পল হাডসন গত সপ্তাহেই সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, তাদের তৈরি টিকা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হিসেবে তৈরি হতে যাচ্ছে। এটাই একমাত্র ভ্যাকসিন, যা কোভিড-১৯ চিকিৎসায় সাফল্যের প্রমাণ দেবে।

ইনোভিও

ডিএনএ ভ্যাকসিন বানাচ্ছে পেনসালিভানিয়ার বায়োটেক ফার্ম ইনোভিও ফার্মাসিউটিক্যালস।। ট্রায়াল যদিও প্রথম পর্যায়েই আছে। সংস্থাটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলা হয়েছে, তাদের গবেষণাকে অনুমোদন করেছে মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। ইনোভিও বায়োফার্মের উদ্যোগে সামিল মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসও।

চীনা টিকা

চীনের দুই সরকারি সংস্থা উহান ইনস্টিটিউট অব বায়োলজিক্যাল প্রোডাক্টসের তৈরি ‘ইনঅ্যাক্টিভেটেড ভ্যাকসিন’ এবং বেইজিং ইনস্টিটিউট অব বায়োলজিক্যাল প্রোডাক্টসের ‘বিবিআইবিপি কর্ভ’ ভ্যাকসিন দুটিরও প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষা চলছে একসঙ্গে।

ইম্পিরিয়াল কলেজ অব লন্ডন

লন্ডনের ঐতিহ্যশালী ইম্পিরিয়াল কলেজ ভ্যাকসিন তৈরি করছে আরএনএ টেকনোলজিকে কাজে লাগিয়ে। ইম্পিরিয়াল কলেজের ভ্যাকসিন গবেষণার নেতৃত্বে রয়েছেন অধ্যাপক রবিন শ্যাটক। গবেষকরা জানিয়েছেন, গত দু’মাসে ল্যাবরেটরিতে পশুদের শরীরে এই আরএনএ ভ্যাকসিনের ট্রায়ালে সাফল্য মিলেছে। বিশ্ব বাজারে ওই টিকা পৌঁছে দিতে ভ্যাকইকুইটি গ্লোবাল হেলথ নামে একটি কোম্পানিও খুলেছে ইম্পিরিয়াল কলেজ।

নোভারটিস

জিন থেরাপি ট্রিটমেন্টের উপর ভিত্তি করে ভ্যাকসিন বানাচ্ছে সুইস বায়োটেক কোম্পানি নোভারটিস। অ্যাডেনোভাইরাসকে ভেক্টর হিসেবে ব্যবহার করে এই সংস্থাও ভেক্টর ভাইরাল ভ্যাকসিন তৈরি করছে। যদিও এই ভ্যাকসিনের ট্রায়াল এখনও পশুদের শরীরেই হয়েছে। প্রথম পর্যায়ের ট্রায়াল হবে এ বছরের শেষের দিকে।

কানসিনোবায়ো

চিনের এই বায়োটেকনোলজি ফার্মও অ্যাডেনোভাইরাসকে ভেক্টর হিসেবে ব্যবহার করে ভ্যাকসিন বানাচ্ছে। এই গবেষণায় তাদের সঙ্গে রয়েছে দেশের অ্যাকাডেমি অব মিলিটারি মেডিকাল সায়েন্সেস। ল্যানসেট মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত রিপোর্টে গবেষকরা বলেছিলেন এই ভ্যাকসিনের প্রথম পর্যায়ের ট্রায়াল সফল হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালের প্রস্তুতি চলছে।

জনসন অ্যান্ড জনসন

বায়োমেডিক্যাল অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটির যৌথ উদ্যোগে এই ভ্যাকসিন তৈরি করছে জনসন অ্যান্ড জনসনের রিসার্চ উইং জ্যানসেন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। অ্যালেক্স গোরস্কি জানিয়েছেন, ভ্যাকসিন তৈরির কাজ শেষ। ল্যাবরেটরিতে পশুদের শরীরে ট্রায়ালের ফল সন্তোষজনক। জুলাইতে মানুষের শরীরে ক্নিনিকাল ট্রায়াল শুরু হবে। ইতিমধ্যেই মার্কিন সরকারের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে প্রায় ১০০ কোটি ভ্যাকসিনের ডোজ তৈরির প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে জনসন অ্যান্ড জনসন।

সিঙ্গাপুরের ভ্যাকসিন

সিঙ্গাপুরের ডিউক-এনইউএস মেডিকেল স্কুলের গবেষকেদের একটি ভ্যাকসিন করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার পাশাপাশি এটি রোগ নিরাময়েও ব্যবহার করা যাবে। সম্প্রতি গবেষকেরা এ দাবি করেছেন। আগস্ট মাসে এর পরীক্ষা শুরু হচ্ছে।

ক্লোভার বায়োফার্মাসিউটিক্যালস

ব্রিটিশ ফার্মাসিউটিক্যালস জিএসকে-র সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে করোনার সংক্রামক প্রোটিন থেকে ভ্যাকসিন বানাচ্ছে ক্লোভার বায়োফার্মাসিউটিক্যালস। এই ভ্যাকসিনের প্রথম পর্যায়ের ট্রায়াল হয়েছে।

একটি মন্তব্য করে যান

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন